প্রস্তাবিত বাজেট বনাম গরীববান্ধব বাজেট-২
জাইম ফারাজী

২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট এমন সময় ঘোষণা করা হয়েছে, যখন মহামারির ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মন্দার দিকে বিশ্ব ধাবিত হচ্ছে। কারণ ইউক্রেন বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম শস্য রপ্তানিকারক দেশ।তাই পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক দুই ক্ষেত্রেই নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ অনেকেই আশায় ছিলেন যে, নতুন বাজেট তাদের স্বস্তি দেবে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমবে এমন বাজেট দেবে সরকার। কিন্তু আদৌ তা হয়েছে কী!
দ্রব্যমূল্যের চাপে থাকা মানুষের সামাজিক সুরক্ষার প্রেক্ষাপটে খোলা বাজারের  তথা ওএমএস-এ বরাদ্দ ২২৩ কোটি টাকা কমে যাওয়াটাও চরম বিশ্ময়কর! এছাড়াও হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ না বাড়িয়ে বরং তা আরও ৯৫ কোটি টাকা কমে যাওয়াও চরম বোকামী, তা বলার আপেক্ষা রাখেনা।
করোনাকালে এমনিতেই দরিদ্র ও হত দরিদ্র বেড়েছে বেনোজলের মতো। সেই ক্ষেত্রে হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ জ্যামিতিক হারে না বাড়িয়ে কর্মসৃজন সংকোচনের যে বাজেট করা হয়েছে। সেই বাজেটকে গরীববান্ধব বাজেট বলা হাস্যষ্কর!
 
 সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘এবারের বাজেটে গরিবের জন্য তেমন কিছু নেই। সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে মধ্যবিত্ত।’ কথাটার মধ্যে যে সত্যতা আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
তবে অস্থিতিশীল বিশ্বে কৃষির জন্য ক্রমবর্ধমান বরাদ্দ এবং সে অনুযায়ী খাদ্য নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেওয়া একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ পদক্ষেপ এটা মানতে হয়। সেই অর্থে এই বাজেটকে কিছুটা কৃষিবান্ধব বলা যেতে পারে। যদিও কিছু কথা আছে সে দিকে পরে দৃষ্টিপাত করবো।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষি খাত সব সময় বড় ভূমিকা রেখে চলেছে। করোনা মহামারি কালের কঠিন দিনগুলোতে এই কৃষি সেকটর দেশের অর্থনৈতিক মন্দা লাঘবে ভূমিকা রেখেছে।
কৃষিখাত কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎসও বটে। দেশের কৃষি খাত উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশ খাদ্য আমদানি কমাতেও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করছে।
কৃষি খাতে বরাদ্দর প্রস্তাব বেড়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ৩৩ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা।
এছাড়াও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সারের দাম স্থিতিশীল বা কৃষকের ক্রয় ক্ষতার মধ্যে রাখতে আগামী অর্থবছরে সরকার ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে বলে প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং প্রস্তাবিত বাজেটে সারের ভর্তুকি বাবদ চার হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। গত অর্থবছরের বাজেটে সারে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বছর শেষে তা ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এবার ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
কথা হচ্ছে সরকার যদি কৃষির কল্যাণে এমন হাজার হাজার কোটি টাকা ভূতুকি দিতে পারে। তবে হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং হত দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্কতায় দ্রব্যমূল্যের চাপে থাকা মানুষের সামাজিক সুরক্ষার প্রেক্ষাপটে খোলাবাজারের তথা ওএমএস-এ বরাদ্দ বাড়াতে এতো কার্পণ্য কেনো ?
বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবী করা হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী বলছেন, আমরা ১৫ টাকা কেজিতে আড়াই কোটি মানুষকে খাবার দেবো। গরিব মানুষকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। তা হলে ওএমএস-এ বরাদ্দ ২২৩ কোটি টাকা কমে  কী ভাবে!
বরং গরীবরা যাতে এই প্রকল্পের মাধ্যমে কমমূল্যে মোটা চাল-ডা’ল, তেল-নুন কিনতে পারে, সেজন্য এই খাতে বরং বরাদ্দ আরও ২ থেকে তিন হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করা উচিৎ।
দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেই শুধু হবে না। মানুষ যাতে খাদ্য কিনে খেতে পারে সেই বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ।
নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন “দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে হয় না, হয় বণ্টনের অভাবে।”
সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী দাবী করেছেন, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য আমদানী বন্ধ হলেও দেশে দুর্ভিক্ষ হবে না।
তবে মানুষ যাতে খাদ্য কিনে খেতে পারে সেই বিষয়টা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। কারণ গোলা-গুদাম ভরা চাল থাকলেও গরীব মানুষের তাতে কোনো যায় আসে না। যদি না তারা তা কিনে খেতে পারে।
তাই গরীব মানুষের ক্রয় ক্ষমতা থাকতে হবে। এজন্য  হতদরিদ্র ও দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। গরীবদের  হাতে টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে,তা গরীববান্ধব বাজেট হবে না। (চলবে)
 

সর্বশেষ সংবাদ