ভারতের রাষ্ট্রপতির কথায় বাংলাদেশের আম-আদমীরা আশ্বস্ত হবেন কী ?
জাইম ফারাজী

শুরুটা ভালোই ছিলো,শেষটাও এমন বলা গেলে ভালোই লাগতো।কিন্তু কথার মাঝে একটা “কিন্তু” রেখে গেছেন ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতি।
এই কিন্তু-টা কি না রাখলেই চলতো না ? 
বাংলাদেশে প্রবাসী ভারতীয় এবং ঢাকায় ‘ভারতীয় বন্ধুদের’ জন্য সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রামনাথ কোবিন্দ বলেন, “বাংলাদেশে আমাদের বন্ধুদের আমি আবারও আশ্বস্ত করছি, ভারত আপনাদের অসাধারণ আন্তরিকতা এবং বন্ধুত্বকে মূল্যায়ন করে। ৃ আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছি, ভারত এমন একটি বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে যাবে, যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে।”
কথাটার মাঝে একটা খোঁচা আছে, যা পজেটিভ হলেও এমন কথা এড়িয়ে যাওয়াই কূটনীতির শিষ্টাচার। এতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্বস্ত হয়েছেন কিনা জানিনা। তবে আমাদের মতো আম আদমীদের কেউ কেউ যে আশ্বস্ত হতে পারিনি, কারণ বাক্যের মধ্যে একটা বড় ভাইসুলভ বা মাতব্বর গোছের ভাব-ভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।এই কথাটার মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন হুমকির সুরও শুনতে পাওয়া যায়, তা কি বলাই বাহুল্য নয়!
সরকার প্রধান ও বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধান বিদেশ সফরে গিয়ে কী কী বলবেন তা আগে থেকেই নির্ধারিত করা থাকে। সে অর্থে ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতির খসড়াটা ভারতের পররাষ্ট্র মন্তণালয়ের মুসাবিদাতেই লিখা হয়েছে তাতে কোনই সন্দেহ নাই। এমনটাই হয়, হবার কথা। কিন্তু কথা হচ্ছে, ঐ বক্তব্য পজেটিভ হলেও তা অন্তর্নিহিত ভাবটাই আমাকে কিছুটা ভাবাচ্ছে। কারণ অতীতে বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের কিছু কার্যক্রম আমাকে এই কথার আলোয় ষ্পষ্ট করে দিয়েছে।
কথা স্পষ্ট, যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করবে না, ভারত সেই বাংলাদেশকে সমর্থন করবে না।ভালোকথা। এতে আমাদের আপত্তির কোনই কারণই নেই।কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই বাঁচতে ও মরতে চাই।
তবে কথা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থনটা যে “সর্তযুক্ত” তা ভারতের রাষ্ট্রপতি বড় গলায় মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন।তাঁর আসাধারণ কথামালার পূষ্পার্পনের মাঝে তাই এই একটি কাঁটা যেন কেমন একটা খচ্-খচ্ আঘাৎ করছে না ! 
এর আগে সুজাতা সিং বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুকরণে নগ্নভাবে বাধা দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন ভারত সরকার কী চায়।
অতীতেও এমন সমর্থন প্রত্যাহারের ফলেই একদা বাংলাদেশের তথাকথিত ‘শান্তিবাহিনী’ ভারতের আশ্রয় প্রশ্রয় পেয়ে দেশের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভায়ারণ্য করে তুলেছিলো।
তবে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে আশেষ ধন্যবাদ বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে অংশ নেবার জন্য।
বাংলাদেশ ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও ভারতবাসীর আসাধারণ অবদান বাংলাদেশ চিরদিন স্মরণ করবে।
ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বকে ভারত সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমরা আমাদের বন্ধুত্বের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে যথাসাধ্য সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে, আমরা ধারাবাহিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, ছাত্র বিনিময় এবং সহযোগিতার একাধিক ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মকাণ্ড দেখেছি। এর সবই আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌম সমতা এবং নিজ নিজ দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে একটি টেকসই ও গভীর বন্ধুত্বের নিশ্চয়তা। আমি আনন্দিত যে, আমাদের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে।
মহান বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিদের সম্বোধন শেষে বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ৫০তম বার্ষিকীতে আমি আপনাদের ১৩০ কোটি ভারতীয় ভাই-বোনদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমরাও আপনাদের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক দিনটি উদযাপন করছি। পঞ্চাশ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার আদর্শিক মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছিল এবং গর্বিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। এ উপলক্ষ্যে আমি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের, বিশেষ করে নির্যাতিতা মা-বোন-কন্যাদের অবর্ণনীয় দুঃসহ স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাদের আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবিই এই অঞ্চলকে বদলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতো এত মহাকাব্যিক ত্যাগের সাক্ষী মানব সভ্যতা খুব কমই হয়েছে। আপনাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রতিটি ভারতীয়, বিশেষ করে আমার প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। সাভারে লাখো শহিদের স্মৃতিসৌধ এবং বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন ছিল আমার জন্য গভীর আবেগময় অভিজ্ঞতা। আমি তার (বঙ্গবন্ধু) ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সারাংশ শুনে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এই ভাষণ সর্বদা ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের চেতনাকে উদ্দীপিত করে। তাই ইউনেস্কো এটিকে বিশ্বতালিকায় ন্যায়সঙ্গতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, আপনাদের সংগ্রাম ভারতে যে মাত্রায় সহানুভূতি এবং তৃণমূল-স্তরের সমর্থন লাভ করেছে তা ইতিহাসে বিরল। ভারতের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশের জনগণকে সম্ভাব্য সব সহায়তা দেওয়ার জন্য হৃদয়-দ্বার উন্মুক্ত করেছে। প্রয়োজনের সময়ে আপনাদের সাহায্য করা আমাদের জন্য সম্মানের এবং পবিত্র দায়িত্ব ছিল। ইতিহাস সর্বকালে আমাদের বন্ধুত্বের এই অনন্য ভিত্তির সাক্ষ্য দেবে যে, গণযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই যুদ্ধের কয়েকজন সাক্ষী (ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েরই) এখানে দর্শকদের মধ্যে রয়েছেন। যাদের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও রয়েছেন। আমাদের বিশ্বাস তারা বন্ধুত্বের শক্তির জীবন্ত সাক্ষ্য, যা পাহাড়কেও টলাতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছি এবং আপনাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। ভৌগোলিক সুবিধা ও আপনাদের দেশের চমৎকার অর্থনৈতিক সাফল্য সমগ্র উপ-অঞ্চল এবং বিশ্বকে উপকৃত করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান ধারণা রয়েছে যে, ঘনিষ্ঠ উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সংযোগ স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সোনার বাংলা গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করবে।
রামনাথ কোবিন্দ বলেন, বাংলাদেশ একটি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উর্বর জমি এবং নদীবিধৌত অনন্য দেশ। এটি কবি, শিল্পী, পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের দেশ। ঐতিহাসিকভাবে এই ভূখণ্ডের মানুষ সবসময় শিল্প এবং পাণ্ডিত্যকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছে। আপনারা সর্বদা আপনাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রভাবশালী এবং ঐক্যবদ্ধ উপাদান- মন, সংস্কৃতি এবং ভাষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলে আপনাদের ইতোমধ্যেই একটি সুসংগত, সম্প্রীতিপূর্ণ এবং গতিশীল সমাজের অনন্য মেলবন্ধন রয়েছে।
ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, যদি আমাদের অংশীদারিত্বের প্রথম ৫০ বছর অসাধারণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শুরু হয়, যা আমাদের জনগণের মধ্যে একটি গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করে, তাহলে সম্ভবত এই সীমাকে আরও বৃদ্ধি করার সময় এসেছে। এটি অর্জনের জন্য আমাদের ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ বিশেষ করে আমাদের যুবকদের ধারণা, সৃজনশীলতা, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির জগতে যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী অগ্রগামী উদ্যোগ তৈরিতে অনুপ্রাণিত করতে হবে। আমাদের উদ্ভাবকদের আমাদের সাধারণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নতুন সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আহ্বান জানানো উচিত।
তিনি বলেন, আমাদের আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক সেরা ধারণাগুলো খুঁজে বের করার জন্য চিন্তাবিদদের আমাদের নিজস্ব অনন্য সাফল্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য অনুরোধ করতে হবে। আন্তঃসংযোগের একটি নতুন যুগে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ধারণা এবং উদ্ভাবনের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের সুযোগ তৈরি করতে পারি। উৎপাদন এবং পরিবহণ সংযোগের গভীরভাবে সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে করতে আমাদের ব্যবসাগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত, যা আমাদের উপ-অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র এবং পণ্য ও পরিষেবাগুলোর জন্য বিশ্বের বৃহত্তম বাজার হতে সক্ষম করবে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনে আমার সফর ও অংশগ্রহণের জন্য আপনাদের আমন্ত্রণ একটি অনন্য সম্মান। এটি আমাদের বিশেষ বন্ধুত্বের একটি সত্যিকারের প্রতিফলনও বটে। আমি আনন্দিত যে, প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির মতোই, কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার পর ভারতের বাইরে আমার প্রথম সফর আপনাদের দেশ বাংলাদেশে। মুজিববর্ষ উদযাপনে অংশগ্রহণ করতে পেরে আমিও সম্মানিত। পঞ্চাশ বছরের কিছু আগে, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু তখন সমালোচক, সন্দেহবাদী এবং নিন্দাকারীদের কাছে এটি একটি দূরবর্তী এবং অসম্ভব স্বপ্ন বলে মনে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেন মুক্তির সম্ভাবনাকে বাতিল বলে মনে হচ্ছিল। একটি নিষ্ঠুর, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সুসজ্জিত শত্রু, যারা কোনো কিছুতেই থামবে না, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাংলাদেশের প্রতিকূলতা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নৈতিক দৃঢ়প্রত্যয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি ন্যায়বিচারের জন্য তার অদম্য দৃঢ়তা ছিল সত্যিকার অর্থে পটপরিবর্তনকারী। ফলস্বরূপ, বিশ্ব একটি মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছাকে কোনো শক্তি দ্বারা দমন করা যায় না, তা যতই নৃশংস হোক না কেন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, আমার মনে আছে একজন যুবক হিসাবে বঙ্গবন্ধুর নৈতিক সাহসে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। অন্যদের মতো আমিও তার বজ কণ্ঠে এবং সেই সময়ে বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের আকাক্সক্ষা বহনকারী উপলব্ধিতে আকর্ষিত হয়েছিলাম। আমার প্রজšে§র লাখ লাখ ভারতীয়ের মতো, আমরা একটি অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ে উল্লসিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশের জনগণের বিশ্বাস ও সাহসে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।
বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন একটি বাংলাদেশ যা শুধু রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়, বরং একটি ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রও বটে। দুঃখের বিষয়, জীবদ্দশায় তার দর্শন বাস্তবায়িত হতে পারেনি। স্বাধীনতাবিরোধীরা বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে, বুলেট এবং সহিংসতা এমন একটি আদর্শকে শেষ করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ়প্রত্যয় এবং তার বিদ্রোহী চেতনার দ্বারা চালিত হয়েছেন। যেমনটি মহান কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতায় বর্ণিত হয়েছে। এ সময় তিনি কয়েকটি লাইন উচ্চারণ করেন। সেগুলো হলো- ‘মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/ বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত।’
ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও উদ্যোগী জনগণ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করছে। আমাদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং বন্ধুত্ব আরও গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসুন আমরা আমাদের জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাই।
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন থাকবে ভারতের’র
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে- এমন একটি বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দিল্লি ফেরার আগে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান। তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে রামনাথ কোবিন্দ নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। বাংলাদেশে প্রবাসী ভারতীয় এবং ঢাকায় ‘ভারতীয় বন্ধুদের’ জন্য সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রামনাথ কোবিন্দ বলেন, বাংলাদেশে আমাদের বন্ধুদের আমি আবারও আশ্বস্ত করছি, ভারত আপনাদের অসাধারণ আন্তরিকতা এবং বন্ধুত্বকে মূল্যায়ন করে। আমরা ঘনিষ্ঠভাবে আপনাদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। উন্নয়নের মধ্যদিয়ে যৌথ সমৃদ্ধি অর্জন এবং আমাদের জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চাই। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কোবিন্দ বলেন, বাংলাদেশের যে মূল চেতনা, একটি প্রগতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও সমপ্রীতির সমাজ গড়ে তোলা, সেই মূল্যবোধকে এগিয়ে নেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছি, ভারত এমন একটি বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে যাবে, যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে।
ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের ৫০ বছর পূর্তির এই বছরে ঢাকায় আসতে পেরে নিজের আনন্দের কথা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জানান ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান। বলেন, বাংলাদেশের মানুষের উষ্ণ ভালোবাসা তার হৃদয় ছুঁয়েছে। গত বছর কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর এটাই আমার প্রথম বিদেশ সফর। আর বাংলাদেশে আমার প্রথম সফর হলো এমন এক বছর, যখন আমরা যৌথভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করছি। স্বৈরশাসকের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য এ দেশের মানুষ যে বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেজন্য শ্রদ্ধা জানান ভারতের রাষ্ট্রপতি। ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অদম্য সাহসের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে অভিনন্দন জানান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করা বাংলাদেশি ও ভারতীয় শহীদদের স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রামনাথ কোবিন্দ।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কোবিন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জনগণ যে নৃশংসতা ও গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছিল এবং নৃশংস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রামের কথাগুলো আমার মনে পড়ছিল। আজ যেমন আপনাদের দেশ এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে, তেমনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের লড়াই ন্যায্য ছিল। এ লড়াই ছিল মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল প্রকৃতপক্ষে পেশিশক্তিকে পরাজিত করে অধিকারের জয়। 
রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ বলেন, ভারতীয়দের হৃদয়ে বাংলাদেশের জন্য ‘একটি বিশেষ স্থান’ রয়েছে। দুই দেশের মানুষে মানুষে রয়েছে বহু পুরনো আত্মীয়তা, রয়েছে ভাষা আর সংস্কৃতির প্রাচীন বন্ধন। মুক্তিযুদ্ধের পর, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের মধ্যদিয়ে গেছে। ভারতও এই সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমাদের দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, তাও প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের এই যৌথ গল্পে ভূমিকা রেখেছে। রামনাথ কোবিন্দ বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিপথ যে পরস্পর সংযুক্ত, সম্পদ ও অভিজ্ঞতার বিনিময়ই যে টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র, দুই দেশের নেতৃত্বই তা জানে। আমি এটা জেনে আনন্দিত যে, আমাদের এই যৌথ প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব করতে উভয়পক্ষই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিরাট সম্ভাবনা দেখছি আমি। ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের গুরুত্বের বিষয়ে তার দেশ সচেতন। এই চেতনার আলোকে, একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হয়ে ওঠার যাত্রায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিয়ে যেতে, বৃহত্তর সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অংশীদার হতে ভারত অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমি দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে, বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং আমাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মধ্যে আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগটি কাজে লাগাতে অনুরোধ জানাবো। ভারত ও বাংলাদেশ- দুই দেশই যে মোট জনসংখ্যায় তরুণ কর্মীবাহিনীর সংখ্যাধিক্যের সুবিধা ভোগ করছে, সে কথা তুলে ধরে এর সুফল কাজে লাগাতে আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ। তিনি বলেন, এই অনন্য বছরে, মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং আমাদের বন্ধুত্বের ৫০তম বার্ষিকী এবং সেইসঙ্গে ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপন করার সময়ে, আসুন আমরা আমাদের জাতির স্থপতিদের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজেদেরকে পুনরায় উৎসর্গ করি। 
মাননীয় রাষ্ট্রপতি,আপনার দেশ জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের সব চেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ।বহু জাতি ও নৃগোষ্ঠির সম্মিলিত বিশাল ভারতের টেকসই গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন কখনোই ওঠে না যে, আপনার দেশ কারা শাসন করবে- ধর্মনিরপেক্ষ দল না কট্টর হিন্দুবাদী কোনো দল। কারণ এটাই গণতন্ত্রর বিধান। জনগণ যাদের ভোট দেবেন,তারাই সরকারে যাবেন। এতে অন্য কোনো দল ,গোষ্ঠি বা দেশের বলার কিছু থাকার কথা নয়। তেমনি ভারতেরও উচিৎ বাংলাদেশের জনগণের প্রতি এই শ্রদ্ধাটা রাখা যে তারা কাদের সরকার গঠনের জন্য ভোট দেবেন- তারা কোন চেতনা বহন করেন, এটা বড় কথা নয়। কারণ রাষ্ট্র জনতার। সুতরাং জনগণই সরকার নির্বাচিত করবে।বরং কোন গোষ্ঠিকে বিশেষ চেতনাধারী বলে তাদের জনগণের ঘাড়ের উপর চাপিয়ে রাখতে সহযোগীতা করাটা গণতন্ত্র তথা গণমানুষের আকাঙ্খার পরিপন্থী।
১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের উপর নব্য যে উপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো, তারা তা মানে নি।আবার যদি নয়া উপনিবেশবাদীরা নয়া রূপে এদেশের জনতার ঘাড়ে গণতন্ত্রের মূখোশ পরা নয়া স্বৈরাচারী দানব চাপিয়ে দেয়। তাও তারা মানবে না।ভারত একটি গণতানিস্ত্রক দেশ।সুতরাং অন্য দেশের গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের শ্রদ্ধা থাকবে,এমন প্রত্যাশা বাংলাদেশের জনগণ করতেই পারে।
 

সর্বশেষ সংবাদ