কোন পথে বাংলাদেশ(২)
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পরিশুদ্ধ গণতন্ত্রই একমাত্র আকাঙ্খা।
জুলফিকার মুর্তজা জুলফি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয় বঙ্গবন্ধুর নামে। ১৯৭০নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তা  পরিচালিত হলেও, এটা ছিলো একটি জনযুদ্ধ। যে যুদ্ধে কিছু কুলঙ্গর রাজাকার আলবদর ও রাজীনৈতিক দালল ছাড়া পুরো জাতিই যুদ্ধ করেছে ঘরে বাহিরে অন্তরে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার পরে রাজাকার  আমলা ও পুলিশের সহযোগীতায় যাত্রাকারী রাজনৈতিক সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত ছিলো অদূরদর্শী।
যেমন ১৯৭৩ সালের প্রথম বিসিএস, যা তোফায়েল বিসিএস নামে পরিচিত তা নগ্ন দলীয় করণ। তৎকালে দেশের মেধাবী ছাত্রদের অবহেলা করে ছাত্র লীগের অল-থার্ডক্লাশ ছাত্রদেরও বিসিএস-এ মনোনীত করা ছিলো বড় ভূল। কারণ অযোগ্য লোকেরা যোগ্যতার পরিচয় যেমন দিতে পারেনা। তেমনি তারা যোগ্য লোকও তৈরী করতে পারেনা। বাংলাদেশের বিসিএস পরবর্তীতে অনেকটা নিরপেক্ষ হলেও হলেও বর্তমানে তা আবারও পক্ষপাত গ্রস্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
 
১৯৭২ সালের বহু কুখ্যাত বই দেখে নকল করার এসএসসি পরিক্ষার নোংরা কালচার পরবর্তীতে এসে বন্ধ করা সম্ভব হলেও তা এখনো রোধ করা যায়নি। বাংলাদেশে দুর্নীতিগ্রস্থ সেক্টর গুলোর মধ্যে দুর্নীতিতে বলিয়ান হওয়ার জন্য সব সময় এগিয়ে আছে শিক্ষা অধিদপ্তরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ।
উপনিবেশিক আমলের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও করা হয়নি এমন যাতে জাতির জন্য লাগসই শিক্ষা বলে মনে হতে পারে।
 
বস্তুত শিক্ষা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও দেশ জুড়ে শিক্ষার হাল হকিকৎ বিবেচনা করলে বলে দেয়া যায়, শিক্ষা এখন কোনো সেবা নয় বরং এক লাভজনক পণ্য। এই যখন অবস্থা তখন শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড বললে সেই মেরুদন্ড যে কতটা নড়বড়ে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
শিক্ষকরা এখন জাতির অভিভাবক নন তারা এখন দলীয় পাÐা না হয় শিক্ষা ব্যাবসায়ী। এই যখন অবস্থা তখন এই জাতির ভবিষ্যৎ যে খুব উজ্জল নয় তা বলে দেবার প্রয়োজন পড়েনা।
 
বাঙ্গালী সামরিক জাতি নয় বলে যে অপপ্রচার ছিলো তা ১৯৭১ এ খÐন করেছে এদেশের সেনা ও মুক্তিবাহিনী। বঙ্গবন্ধু আনুপস্থিতে তার যোগ্য ও বিচক্ষণ সহকর্মী তাজুদ্দিন আহমদের নেতৃত্ত¡াধীন প্রবাসী সরকার দেশ স্বাধীন করার জন্য যে সেনাবাহিনীর বিন্যাস করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই বাহিনী যেমন গৌরব, তেমনি নিন্দার ধারক-বাহক বললে অতুক্তি হবেনা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অসীম ত্যাগে কথা আজ  ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয় হলেও এই সেনাবাহিনীর হাতেই আছে দু’টি কলঙ্কের দাগ। প্রথমতঃ স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথা সেনাবাহিনির পথভ্রষ্ট একটি দল জাতির মহান নেতা স্বাধীনতার স্থপতি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ড রোধ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় তৎকালীন সেনা ও রক্ষী বাহিনীর নেতৃবৃন্দ।
দ্বিতীয়তঃ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণাকারী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্রিগেড ‘জেড ফোর্সে’র অধিনায়ক, সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াকেও  সেনাবাহিনীর  কিছু বিদ্রোহী সদস্য নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীনতার মাত্র ১০ বছর পূর্ণ না হতেই।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ইপিআর পরবর্তীতে বিডিআর-এর অসীম ত্যাগের কথা আজ ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয় হলেও এই বিডিআর-এর হাতে আর এক কলঙ্ক’র দাগ পড়ে।
২০০৯ সালে বিডিআর-রা পিলখানায় বিদ্রোহ করে আধিনায়কসহ ৫৭জন সামরিক কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে খুন করে।
জাতীয় দূর্যোগ মোকাবেলায় এবং আন্তর্জাতিক শান্তিমিশনে গৌরবজনক ভূমিকার কারণে প্রশংসার যোগ্য সেনাবাহিনী ও বিডিআর-এর এইসব কলঙ্ক মোচন সম্ভব নয়। তাছাড়া স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উত্তরসূরী এই বাহিনীর বিভিন্ন সময় পাকিস্থানের মতো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে বারবার। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ এছাড়াও ২০০৭-২০০৮ এর সেনা সমর্থিত সরকার বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর জন্য ডার্ক পয়েন্ট। আমাদের প্রত্যাশা আগামীতে এই বাহিনী এমন কলঙ্ক মোচনে সর্বদা সজাগ থাকবে।
১৯৭০ এর দেশ যখন সেনা-শাসনাধীন ও পরাধিন তখনও পরিছন্ন নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হলেও পরবর্তীতে তা আর করা সম্ভব হয়নি। এর দায়ভার ক্ষমতালোভী পলিটিশিয়ানদেরই ঘাড়ে  পড়ে। কোন ক্ষুধার্ত মানুষরা যেমন খাই খাই করে, তেমনি হাজার বছর পরাধীন বাঙালী জাতি স্বায়ত্ব শাসন হাতে পেয়ে তেমনি এমন আত্মহারা হয় যে, তাদের খাই খাই এর মানসিকতা  উগ্র ও উলঙ্গভাবে দেশ জাতি ও বিশ্বের কাছেু তুলে ধরে! যে এক সময় ক্ষমতার মসনদে বসে, সে সেখানে চিরস্থায়ী আসন ব্যবস্থা পাকাপাকি করার চেষ্টা চরিত্র করতে থাকে। এজন্য গণতন্ত্রকে হত্যা করতেও কেউ কেউ পিছু পা হয়নি।
 
ভোট অনুষ্ঠিত হলে ভুয়া ভোট, কারচুপি, ভোটকেন্দ্র দখল করে ইচ্ছা মত নিজেদের জিতিয়ে নেয়া, আমলাদের হাত করে নিজেদের পক্ষে রায় ঘোষণা ইত্যাদি বন্ধ করতে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা করেও এসব নোংরামী রোধ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতার চেয়ার যখন যার কাছে থাকে সবাই নিজেদের পছন্দের লোক কে কি-পয়েন্টগুলোতে বসিয়ে নিজেদের দিকে ঝোল টানার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত¡বধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করায়, গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন দেশের বৃহৎ রাজনৈতি দল বর্জন করে। প্রায় এক তরফাভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জয়লাভ করে যার সিংহভাগ আসনই বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিতদের দখলে।
 
ঊনবিংশ শতকে ভারতবর্ষের শিল্প-সাহিত্য ও্র রাজনৈতিক অঙ্গনে এক রেঁনেসা উদ্ভব হয়। যার ফলশ্রæতিতে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশদের পরিচালনায় ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের সূচনা হয়। তাতে অংশগ্রহণকারী পলিটিশয়ানরা ছিলেন সমাজের অগ্রগণ্য মানুষ। সংসদ সদস্যদের বলা হত আইন প্রণেতা। আক্ষরিক অর্থেই প্রথম দিকে রাজনীতি করত আইনজীবীরা তৎকালীন রাজনীতি সচেতন ব্যরিস্টার, উকিল, মুক্তার রাজনীতি করতেন। রাজনীতি করতেন ধনবান ও শিক্ষিত পরিবারের মানুষেরা। যার ফলশ্রæতিতে রাজনীতি একটা পরিচ্ছন্ন ও নিষ্কলুষ অবস্থার মধ্যে যাত্রা শুরু করলেও ক্রমেই এই অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠা ব্যক্তিরা গÐগ্রাম থেকে আসা মা-বাবা-বান্ধবহীন তরুণরা পাড়ার মাস্তাান বা মাস্তান ষÐারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রিনে মরিয়া এবয় অনেকটা সফল। ফলে সভ্য-ভব্য, ন¤্র-ভদ্র লোকেরা এদর দাপটে কোনঠাসা হয়ে সরে পড়ায় রাজনীতি এখন মাস্তান বা  মাস্তান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিষয় হয়ে দাঁিড়য়েছে। 
এ অবস্থার জরুরী পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ এর ফল কখনোই  শুভ হতে পারে না।
এজন্য সুষ্ঠু নির্বাচন একান্ত জরুরী। আর সুষ্ঠু নির্বাচণের জন্য চাই সুষ্ঠু ভোটার তালিকা। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এবং নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা।
কারণ জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা জনগণের সরকার গঠন করা না গেলে জাতির স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত সম্ভব হবে না। তাই পরিশুদ্ধ গণতন্ত্রই একমাত্র পথ।
এহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই প্রত্যাশাই সব জনগণের অন্যতম আকাঙ্খা।