কোন পথে বাংলাদেশ ?
জুলফিকার মুর্তজা জুলফি

স্বাধীনতার সুবর্ণ-জয়ন্ত্রী পালন করছে অর্থাৎ হাফসেঞ্চুরী করেছে এই বাংলাদেশ। দীর্ঘ ৫০ বছর পাড়ি দিয়ে এই স্বাধীন স্বদেশের সামনে একটি প্রশ্ন বোধক চিহ্ন ঝুলে থাকে কোন পথে বাংলাদেশ? অনেক অর্জন সত্তে¡ও বলতে হয়, তা অপ্রতুল। এই জাতির পাওনা ছিলো আরও বেশি।
সম্ভাবনাময় এই স্বপ্নকে লালন করে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দ্বায়িত্ব যে সরকারের কোনো সরকারই তা সঠিকভাবে পালন করেনি বা করতে পারেনি। এমনি শত ব্যর্থতার মধ্যে বাঙালির যত গৌরবজনক আর্জন তার সিংহভাগই বেসরকারী খাতের। ঐ অর্জনগুলো আরও সাফল্যের পালকে গৌরবাঞ্চিত হতে পারত কিন্তু দূরদর্শী রাজনীতিকের অভাব, অনভিজ্ঞ আমলাতন্ত্র সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও অপরিপক্ষ সরকারের জন্য এই জাতির অগ্রগতি অনেকটাই ব্যহত হয়েছে। এজন্য কাউকে সরাসরি দোষারোপ না করে বলা যায় এই ব্যর্থতা জাতীয় সংস্কৃতির অভাবজনিত ব্যর্থতা। কারন সহস্র বছরে বাঙালী নামক যে জাতি কালক্রমে গড়ে উঠেছিলো তার শেষ হাজার বছরই তারা ছিলো পরাধীন। তারা এই সময় স্বশাসনের সুযোগ একদম পায়নি বললেই বলে।
ভারতবর্ষের সব চেয়ে উর্বর এই জনপদকে পদানত করতে সর্বসময়ই উদগ্রীব ছিলো বিদেশী ও ভারতবর্ষের শক্তিশালী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির র‌্যাজন্য ও যোদ্ধারা। এর মধ্যে সর্বশেষ দখলদার দাক্ষিণ্যত্যের সেন রাজারা ছিলো সর্বশেষ হিন্দু রাজা।
ইকতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে এই জনপদ বিদেশী মুসলিম নৃপতিদের পদানত হয় একাদশ শতকে। তারও অর্ধশত বছর পরে বিট্রিশ ও সর্বশেষে দ্বিজাতিতত্বের গ্যাড়কলে, পাঞ্জাব-বেলুচ-পাঠানদের দুই যুগের শাসন শোষণ এই জাতির মেরুদন্ডকে চতুশ্পদী প্রাণীর মত মাটির আনুভুমিক করে রেখেছিলো।
তুর্কি,আফগানী-আরবী মোগলদের জয় যাত্রা যে বাংলাদেশে এসে ঠেকে ছিলো ১৭৫৭ সালে। সেখান থেকে ব্রিটিশ বেনিয়াদের শোষণ শাসন শুরু হয়। উপরের সব রাজা-বাদশা-সুলতানরা এই মাটিতে আবাস গড়লেও। ব্রিটিশ ও পশ্চিম পাকিস্থানীদের বঙ্গভূমীকে ব্যবহার করে হিন্টারল্যন্ড হিসেবে। এদেশের গ্রাম্য চাষিদের আয়কর কলিকাতা শহরের বাগানবাড়ীর রংমহলে ব্যয় হতো। ব্রিটিশদের শোষিত সম্পদ গিয়ে জমা হতো লন্ডনে, আর পাকিস্তানীরা জমা করতো পিন্ডিতে।
 
ব্রিটিশ আমলে স্টিমার, রেলসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পূর্ব বাংলার জামীদার শ্রেণী পূর্বের সম্পদ দিয়ে কলকাতার বাগান বাড়ী বানায়। রংমহল গড়ে, ইংরেজদের সাথে টেক্কা দিয়ে বিলেতি ভোগ-ব্যসনে মত্ত¡ থাকে। কলকাতা কেন্দ্রিক এই জমিদার শ্রেনীর খুব কম অংশই এই এলাকার জনজীবনের উন্নয়নে কাজ করে। ফলে হাজার   বছর ধরেইে বাঙালী এক বঞ্চিত জাতি হিসেবে গড়ে ্ওঠে। আর বাংলার সবচেয়ে বড় বঞ্চনা ছিলো শিক্ষার বঞ্চণা। যে বঞ্চণার মাসুল এখনো গুনতে হচ্ছে।
 
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ নামক জনপদটি যখন পাকিস্তানে পরিণতি পায়। তখনও এই বঞ্চণা ধামাচাপা দিতে আসে পাক-পাঞ্জাবরা। তাই কিছু কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত বর্ণহিন্দুরা ভারতীয় বনে গেলে এই শূন্যতাকে পুরণ করে দেয়ার অবকাশ হয়ে ওঠেনি।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ছিলো। আর্য, আরব আর মোগলদের ভারতে প্রবেশের প্রবেশদ্বার। তাই শিক্ষা, সামরিক শক্তি ইত্যাদি বিষয়ে পশ্চিমারা ছিলো এগিয়ে।
ব্রিটিশ ও শিক্ষিত হিন্দুরা ১৯৪৭ এ চলে  গেলেও তা পাকিস্থানীদের প্রতিস্থাপিত অমলাতন্ত্র সেই শুন্যতা পূরণ করে। বাঙ্গালি জাতির বঞ্চণা ভয়ংকরভাবে প্রকট হয়, যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
তখন দেখা যায় বাংলাদেশের ডিসি’র উপর আমলা নেই, মেজর-এর উপর জেনারেল নেই। এসপি’র উপরে পুলিশকর্তা  নেই।
 
বাঙালি স্বাধীকার আন্দোলনের সফল পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে এসে ১৩ই জানুয়ারী রাষ্ট্র-ক্ষমতা হাতে নিয়ে এক বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হন। তিনি বাধ্যহন রাজাকার আমলা-পুলিশ দিয়ে প্রশাসান ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সচল রাখতে।
যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দেন সেই বাংলাদেশের প্রশাসন ও পুলিশ পরিচালিত হয় সেই সব রাজাকার আমলা-পুলিশের হাতে যারা গত নয় মাস ছিলে হানাদার পাকিস্থানীদের সহযোগী দোসর। যাদের কর্মকণ্ড ছিলো যুদ্ধাপরাধের শামিল!
সব চেয়ে বড় চমক ছিল, সচিব লেবেলের কর্মকর্তার অভাবে উপ-সচিবকে ভারপ্রাপ্ত সচিব, আইজি লেভেলের কর্মকর্তার অভবে। এসপিকে ভারপ্রাপ্ত আইজি, এবং জেনারেলের অভাবে সিনিয়র মেজরদের মেজর জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে নব্য স্বাধীন একটি দেশের প্রশাসন এবং শৃঙ্খলা ও সামরিক বাহিনী তার নবযাত্রা শুরু করে। এর পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ তা বর্তমান জাতি অনুভব করছে।
উপসচিব এর পর যুগ্ম সচিব অতিরিক্ত সচিব অভিজ্ঞতা পার করে একজন সচিব পদের জন্য যোগ্য হন। তেমনি এসপি’র পর এ.আই.জি, ডিআইজি এডি.আইজি পদ পর হয়ে আইজি পদের যোগতা অর্জন করতে হয়। এভাবেই মেজরকে লে.কর্নেল, কর্নেল ও বিগ্রেডিয়ার পদের যোগ্যতা পাড়ি দিয়ে মেজর জেনারেলের পদ অর্জন করতে হয়। বাঙালি জাতি হাজার বছরের বঞ্চণায় এইসব পদ ও পদরীর কালচার বঞ্চিত এক জাতি হিসেবে রয়ে যাওয়ার এই শূন্যতা সৃষ্টি হয় যায়। যার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান!
 
এরই ফলস্বরূপ অচিরেই সদ্য স্বাধীন একটি দেশের প্রশাসন, আইন-শ্ঙ্খৃলা জনিত শূন্যতা পূরণ করা ঐ সব প্রশাসকও পুলিশ কর্মকর্তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ দিকে সরকারের নতুন মন্ত্রী সভার একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কারো মন্ত্রণাালয় পরিচালনার কোন অবিজ্ঞতাই ছিলেনা! স্বদেশ শ্বাসনের অভাবে তাই যোগ উজির আমলা পুলিশও গড়ে ওঠেনি! এজন্যেই তৎকালীন দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরী হয় তা সামাল দেবার জন্য যোগ্য লোকের অভাবটা প্রকট হয়ে উঠে।
প্রয়োজনীয় পদের যোগ্য জনশক্তির অভাবে যাত্রা শুরু করেও অতি অল্প সময়ে তবুও বাংলাদেশ অগ্রগতি কিছুটা বিশ্ময়কর। এর কারণ স্বাধীনতা ! (চলবে)