আরাকান:নয়া প্যালেস্টাইন!
জাইম ফারাজী

বাংলাদেশের প্রতিবেশি আরাকানের নাগরিক রোহিঙ্গারা প্যালেস্টাইনের মতো দেশ থেকেও যেন দেশ হারা এক জাতি।
মিয়ানমার থেকে ২০১৭ সালে যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে, যা পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। অথচ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কবে ফিরে যাবে ফিরতে পারবে কিনা, সে কথা কেউই জানে না।
গরিষ্ঠ রোহিঙ্গা মায়ানমার আর্মীর দমন-নির্যাতন সয়ে অরাকানেরেয়ে গেছে। যে সোয় মিলিয়ন রোহিঙ্গা এদেশে আশ্রয় নিয়েছে, নিজ দেশে ফেরা অনিশ্চিত জেনেই তাদের অনেকে এখানেই নিজেদের ভাগ্য অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য বৈধভাবে কাজের সুযোগ না থাকায় তারা জীবনের তাগিদে নানান কাজ খুঁজে নিচ্ছেন।
অনেকে বলছেন তারা এখানে ভালোই থাকলেও নিজ দেশে ফিরে যেতে চান।
পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর দ্বারা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা।
এরপর থেকে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য কয়েক দফা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার যেমন সহযোগিতা করেনি তেমনি অনেক রোহিঙ্গাও আগ্রহ দেখায়নি।
অনেকে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কথা উঠতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন ।বার্মার কথা বললেই  তারা ভীত হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরে জাতিসঙ্ঘও সেই চুক্তিতে যুক্ত হয়েছিল।
চুক্তিতে বলা আছে, রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফেরত না গেলে তাদের জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না।
রোহিঙ্গারা বলছেন যে, পরিস্থিতিতে তারা পালিয়ে এসেছিলেন সে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সহসা প্রত্যাবাসন হচ্ছে না বলে অনেকেই ধরে নিয়েছে।
রোহিঙ্গারা যাতে অবাধে চলাফেরা করতে না পারে সেজন্য ক্যাম্প ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য খুব একটা সফল হচ্ছে না। রোহিঙ্গারা অনায়াসে ক্যাম্প থেকে আসা-যাওয়া করছে।  চেহারা ও ভাষাগত মিলের কারণে উখিয়ার বিভিন্ন জায়গায় গেলে কে রোহিঙ্গা আর কে বাঙালি সেটা বোঝা খুবই কঠিন।
এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ২০২১ সাল থেকে ভাসান চরে স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।
নোয়াখালীর ভাসান চরে এক লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে স্থানান্তরের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করে বাংলাদেশ।
প্রত্যাবাসনের কোনো লক্ষণ তো নেই বরং রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেগুলোও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় ক্যাম্পের জীবনে রোহিঙ্গাদের আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। নানাভাবে অনেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়তই দেশের নানা প্রান্ত থেকে রোহিঙ্গাদের আটক করছে।
আরাকান ও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আলোচনার আগে আমরা মায়ানমারের বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে পারি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে মিয়ানমার সাবেক পূর্ববর্তী বার্মা স্বাধীনতা লাভ করলেও বিগত প্রায় ৭৫ বছরে দেশটির কোনো শাসক দেশের প্রায় পৌনে ৭ লাখ বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড ও প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলে কখনই পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ বা শাসন করতে পারেননি। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষত প্রত্যন্ত বা দুর্গম অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উগ্রবাদী দল বা গোষ্ঠী এমনকি একরোখা বিপ্লবী নেতারা রাষ্ট্রীয় শাসনের স্থলে নিজস্ব প্রভাব-প্রতিপত্তি, সমান্তরাল শাসন চালিয়েছেন বছরের পর বছর। এ প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে অনেক এলাকাই ছিটমহলের মতো বিচ্ছিন্ন হওয়ার নজিরও রয়েছে। যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাষ্ট্রীয় সেবার মতো সেবা প্রদান, নিজস্ব আইন জারি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, কর সংগ্রহ ও নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও কেন্দ্রের বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আধিপত্য খর্ব করার মতো কার্যক্রম চালিয়েছে যুগের পর যুগ। বর্তমানে ২০টির বেশি ছোটবড় বিচ্ছিন্নতাবাদী দল সমগ্র মিয়ানমারে নানাভাবে নানা লক্ষ্যে তৎপর রয়েছে বলে মনে করা হয়।
এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের মধ্যে বিভিন্ন কারণে আলোচনার শীর্ষে ছিল ১৯৪৭ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতার আগেই প্রতিষ্ঠিত ‘কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন’, ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘কোচিন ইনডিপেনডেন্ট অর্গানাইজেশন’ প্রভৃতি। তবে ইদানীংকালে আগের সব আলোচনা ছাপিয়ে সংবাদের পাদপ্রান্তে উঠে এসেছে ‘আরাকান আর্মি’র নাম। সমগ্র বিশ্বে বিশেষত বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আজ আরাকান আর্মি এক আতঙ্কের নাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
মিয়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বেশি পরিলক্ষিত হয়। পশ্চিমে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে স্থলসীমার অস্তিত্ব এবং মধ্যভাগে বিশাল সমুদ্রসীমা আরাকান আর্মিকে সহজে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ ও প্রয়োজনে আত্মগোপনের অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফলে ২০০৯ সালের ১০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রমেই শক্তি সঞ্চার করতে থাকে আরাকান আর্মি। অন্যদিকে ১৯৭৪ সালে বার্মিজ রাজা বোদাওপায়া কর্তৃক রাখাইন দখলের পর থেকে ক্রমাগত অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার রাখাইনবাসীর কাছে মুক্তির বাণী নিয়ে উপস্থিত আরাকান আর্মির গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে থাকে দ্রুততার সঙ্গে। ২০০৯ সালে একদল বাস্তুচ্যুত তরুণ কোচিন ইনডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় উত্তর মিয়ানমারে দ্রুততার সঙ্গে আরাকান আর্মি নামে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। পাঁচ বছরের প্রস্তুতি নিয়ে ২০১৪ সালে এই আরাকান আর্মির সশস্ত্র যোদ্ধারা রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ করতে থাকে এবং ধারাবাহিকভাবে নিজেদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে থাকে। তখন থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার ও সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে আরাকান আর্মি। ২০১৮ সালে এ সংঘাত তুঙ্গে ওঠে। তবে ২০২০ সালে হঠাৎ উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে। এ যুদ্ধবিরতির ফলে রাখাইন রাজ্যে কেন্দ্রের শাসন শিথিল হয়ে পড়ে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরাকান আর্মি সমগ্র রাখাইন রাজ্যে তাদের প্রভাব আরও বৃদ্ধি করে। ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল আরাকান আর্মির ১১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এ বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল টোওয়ান ম্রাট নাইয়িং ‘ওয়ে অব রাখিতা’ শিরোনামে এক রূপকল্প প্রকাশ করেন। এ রূপকল্পমতে আরাকান আর্মির মূল্য উদ্দেশ্য এমন একটি স্বাধীন আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠা, যা ১৮২৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল এবং মিয়ানমারের পশ্চিমাংশে একটি বড় অংশ শাসন করত।(চলবে)
 

সর্বশেষ সংবাদ

অন্তরালের খবর এর আরো খবর