বাংলাদেশ:জাতিরাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপট-৩
জাইম ফারাজী

সামরিক বাহিনীতে চরম বৈষম্য ছিল। একমাত্র জেনারেল ওয়াসিউদ্দিন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে তিন তারকা বাঙালি অফিসার হতে পেরেছিলেন যদিও তার জন্য তাকে ১৯৬৯ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
১৯৬৯ সালে এ ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেওয়ার পর বাঙালিদের অসন্তোষ সামাল দিতে সেনাবাহিনী এবং সরকারি উঁচু পদে তাদের নিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ১৯৭০ এ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ৬০০০ অফিসারের মেধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ৩০০ জন।  এবং তারা সিংহভাগই নিম্নপদের কর্মকর্তা ছিলেন।
বিশজন অফিসারের মধ্যে হয়তো একজন থাকতেন বাঙালি। যদি ২০০ ক্যাডেট অ্যাকাডেমিতে ঢুকতো, তার মধ্যে বড়জোর চার-পাঁচজন থাকতো বাঙালি। ১৯৭০ এর দিক এসে কিছুটা বেড়েছিল।
 
নিয়োগে একচোখা নীতি তো ছিলই, সেইসাথে সমান প্রতিযোগিতা করে ঢোকার মত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি ঘাটতিও পূর্ব পাকিস্তানে ছিল।
দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তান ব্রিটিশদের তৈরি কতগুলো আবাসিক ইংরেজি স্কুল পেয়েছিল যেগুলো তাদের পাহাড়ি শৈল শহরগুলোতে ছিল। পূর্বপাকিস্তানে তা ছিলো না।
 
সেনাবাহিনীতে বাঙালি শুধু যে কম ছিল তা নয়, সামরিক সরঞ্জামের ৯৫ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ইস্টার্ন ফ্রন্টকে তারা কখনো গুরুত্ব দেয়নি।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত যেভাবে অরক্ষিত ছিল, তাতে বাঙালিদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল পাকিস্তান সরকার কাশ্মীরের জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে হারাতেও হয়ত কার্পণ্য করবে না।
 
পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সংস্কৃতির অনেক অমিল ছিল এবং বাঙালিরা তাদের সংস্কৃতি রক্ষা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিল।
১৯৫৮ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও বাঙালিদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কঠোর নজরদারিতে পড়ে।
 
১৯৫৮ সালে পাকিস্তান শাসকরা বাঙালি সংস্কৃতিকে ভিন্ন খাতে পরিবর্তনের কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে চাপ দেওয়া।
ইসলামি সংস্কৃতি ঢোকানোর চেষ্টা শুরু হয়। জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো তৈরি হয় যার প্রধান কাজই ছিল বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন। সরকারের নীতির স্তুতির জন্য লেখক বুদ্ধিজীবীদের গাড়ি-বাড়ি-টাকা উপঢৌকন দেওয়া শুরু হয়। তাদের বিদেশে ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
১৯৬১ সালে প্রেস এবং পাবলিকেশন আইন করে সংবাদপত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দারুণভাবে খর্ব করা হয়।
১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খান এবং আইয়ুব খানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন সরকারি প্রচারমাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম প্রচার নিষিদ্ধ করে দেন। নজরুল ইসলামের কবিতা প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়, এমনকি তার কবিতার অনেক শব্দ উর্দু করে নতুন করে প্রকাশ করা হয়।
সেই সময় কয়েকটি গ্রুপকে শায়েস্তার জন্য সনাক্ত করা হয়। তারা হচ্ছেন, যেসব শিক্ষকের সাথে আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, কারণ তারা স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে কাজ করবে। নাম করা বুদ্ধিজীবী তা তিনি সরাসরি রাজনীতিতে থাকুন আর নাই থাকুন। বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং বিপ্লবী রাজনীতিক।
২৫শে মার্চের রাতের হামলার টার্গেট এবং নৃশংসতা দেখে বোঝা যায় পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা তাদের নিয়ন্ত্রণ আরোপের পথে কাদের প্রধান সমস্যা মনে করতেন।
বছরের পর বছর এসব অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক-সংস্কৃতি নির্যাতন বাঙালিদের পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে মনস্তাত্বিকভাবে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করেছে এবং তাদের মধ্যে দিনে দিনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ শক্ত হয়েছে।
 
পাকিস্তান ভাঙার পেছনে যে অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাই মূল কারণ ছিল এই বোধোদয় এখন পাকিস্তানে অনেক বেশি। 
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজনৈতিক এবং সামরিক শাসকরা এই বৈষম্যের বিষয়টি বুঝতে পারতেন না, বোঝার চেষ্টাও করতেন না। বিশেষ করে ৫৮ সালের পর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর এই বোধোদয় আরো দূরে সরে গিয়েছিল।
বাঙালিদের অসন্তোষ যত বেড়েছে শাসক শ্রেণী ততই বলেছেন ভারত এসব করাচ্ছে। তবে সন্দেহ নেই যে ভারত পাকিস্তানের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে, কিন্তু ব্যর্থতার প্রধান দায় সে সময়কার শাসকদের।(চলবে)
 

সর্বশেষ সংবাদ

অন্তরালের খবর এর আরো খবর