বাংলাদেশ: জাতিরাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপট (২)
জাইম ফারাজী

পূর্ব পাকিস্তান ক্রমেই পরিণত হচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশের মতো। নানান বৈষম্যের পর পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উৎপাদিত শিল্প পণ্যের প্রধান বাজার। সরকারি হিসাব বলছে ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের বাণিজ্যে পশ্চিমের উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১০ কোটি ডলার।
সিআইএ মে মাসের ১৯৭১ একটি গোপন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল যাতে তারা দেখার চেষ্টা করেছিল যে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলে দুই ভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে তার কী পরিণতি হবে। দু'হাজার দশ সালে ঐ রিপোর্টের যে খণ্ডিত অংশ প্রকাশ করা হয়, তাতে দেখা যায় যে সিআইএ তখন মনে করেছিল পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পশ্চিম পাকিস্তান বড় ধরণের বাণিজ্য সঙ্কটে পড়বে। কারণ তাদের পণ্যের যে মান তাতে বিকল্প বাজার পেতে তাদের সমস্যা হবে।
সিআইএর ঐ গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যত বেড়েছে দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য সেই সাথে বেড়েছে, জীবনযাত্রার মানের তারতম্য বেড়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানকে বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। তবে সেই বিনিয়োগ কখনই ঠিকমত আসেনি, বিশেষ করে ষাটের দশকের আগে। বেসরকারি বিনিয়োগও ছিল নামে মাত্র। ফলে পূর্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল খুবই নিম্ন। 
রিপোর্টে আরও বলা হয়, ১৯৭০ সালের বিধ্বংসী সামুদ্রিক ঝড় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি কতটা অসহায় ও ভঙ্গুর। ঐ সাইক্লোনের পর কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।“
 
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মাথাপিছু আয়ের বিবেচনায় তেমন কোনও তারতম্য না থাকলেও, অব্যাহত এই বৈষম্যের পরিণতিতে পরের ২৫ বছরে পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
পশ্চিম পাকিস্তানে ১৯৪৯-৫০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৩১১ রুপি (১৯৫৯-৬০ সালের মূল্যের ভিত্তিতে) এবং পূর্ব পাকিস্তানের ছিল ২৮৭ রুপি যা প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু ১৯৬৯-৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথা পিছু আয় দাঁড়ায় ৫৩৭ রুপি এবং পূর্ব পাকিস্তানে ৩৩১ রুপি।পাকিস্তানের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দলিল থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়।
পাকিস্তানের পক্ষ যুক্তি তুলে ধরা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের অব্যাহত অনগ্রসরতার ঐতিহাসিক একটি প্রেক্ষাপট ছিল। যে যুক্তি পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষকও অংশত স্বীকার করেন।
 
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ পূর্বের অংশের চেয়ে বাড়তি কিছু সুবিধা পেয়েছিল। পশ্চিমের অবকাঠামো অপেক্ষাকৃত উন্নত ছিল। কুড়ি শতাংশ মানুষ নগরের বাসিন্দা ছিলেন। ভারত থেকে অনেক দক্ষ উদ্যোক্তা পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে চলে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রধানত একটি কৃষিনির্ভর অঞ্চল ছিল। অবকাঠামো ছিল খুবই সেকেলে। উদ্যোক্তা যারা ছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন সম্পন্ন হিন্দু যারা ভারতে চলে গিয়েছিলেন।
যদিও এসব যুক্তি ছিল খোঁড়া। শাসক শ্রেণী অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং পাকিস্তানেও সেটাই হয়েছে।
পাকিস্তানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারি বলেন, শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা এবং উন্নয়নে পিছিয়ে ছিল এই যুক্তি সবসময় এখানে এক পক্ষ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের জন্য যে ভাগাভাগি, সাম্য, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল তা ছিলনা।
বরঞ্চ পাকিস্তানের সামরিক এবং রাজনৈতিক শাসকরা উল্টো পথে হেঁটেছেন।
রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে জবরদস্তি করে দূরে রাখার পাশাপাশি সরকারি চাকরি এবং সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব আটকানোর অব্যাহত চেষ্টা হয়েছে।রকারি উঁচু পদের নিয়োগে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে।
 
১৯৫০ সালে, ২০ % মেধা-ভিত্তিক নিয়োগের পর ৮০ % সরকারি চাকরি দুই অংশের মধ্যে কোটা-ভিত্তিক নিয়োগের নীতি ঘোষণা করা হয়। কিন্ত পূর্ব পাকিস্তানে যোগ্য প্রার্থী নেই এই যুক্তিতে কখনই সে কোটা মানা হয়নি।
১৯৬৬ সালে এসেও দেখা গেছে সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম।
১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের ৮১% ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের আর মাত্র ১৯% পূর্বের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এই অনুপাত ছিল ৬৪ ও ৩৬ %। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৯২ শতাংশ কর্মকর্তাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৭৮ শতাংশই ছিলেন পশ্চিমের বাসিন্দা।
১৯৭১ সালে এসেও সেই চিত্র তেমন বদলায়নি। ঐ বছর সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১৯৬, সেখানে এক পাঞ্জাব প্রদেশের কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ১৯৯।
সরকারি চাকুরীতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যে কোনো রাখ-ঢাক ছিলনা। প্রচুর বিহারী নিয়মিত বাঙালি কোটায় চাকরি পেয়েছে।
ভারত ভাগের সময় ভারতীয় সিভিল সার্ভিস এবং ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের যে ৯৫ জন মুসলিম কর্মকর্তা পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তাদের মাত্র দুইজন ছিলেন বাঙালি। ১/৩-ই ছিলেন পাঞ্জাবি। পূর্ব পাকিস্তানে জেলা বা মহকুমা পর্যায় পর্যন্তও প্রধান প্রশাসকরা ছিলেন অবাঙ্গালি।
 
একজন সচিব হতে বাঙালিদের ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৬৪ সালে দুইজন বাঙালি সচিব হয়েছিলেন, তাও একজনের পোস্টিং ছিল ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সেক্রেটারিয়েটে, অন্যজনের পরিকল্পনা বিভাগে। সংস্থাপন, অর্থ, প্রতিরক্ষার মত জায়গায় বড় পদে বাঙালি অফিসারদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হতো।
বাঙালিদের এমন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হতো না যেখানে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত হয়। গবেষণাপত্রের উপসংহারে তিনি লিখেছেন, সরকারি চাকুরীতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং কম প্রতিনিধিত্ব - এই দুটো বিষয় বাঙালিদের মধ্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতায় ইন্ধন দিয়েছে।(চলবে)
 

সর্বশেষ সংবাদ

অন্তরালের খবর এর আরো খবর