মাইনাস বিএনপি : হাওয়া থেকে পাওয়া-৩
বি.এম. জুলফি

দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটাতে দেশি-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা ও গোষ্ঠিীর তৎপরতা চলছে বলে একটা প্রচারণা আছে।
 বিশেষ করে দেশের বামধারার ছোট ছোট দল ও অনিবন্ধিত বিভিন্ন ছোট ছোট দল এই মহুর্তে নানান তৎপরতা দেখাচ্ছে। এবং এই শ্রেণীর দলের নেতা-কর্মীরা নানান মূখরোচক সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন।
 
এসব সূত্রের খবর হচ্ছে, পরিবর্তন আসন্ন। তবে তা কি-ভাবে তা জানা না গেলেও বিএনপি সংশ্লিষ্ট মহলও এর সঙ্গে জড়িত বলে শোনা যাচ্ছে। এমন ক’জনের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে।
উত্তবঙ্গের বিশেষ একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক একজন ছাত্রনেতা বললেন,ভাই খবর জানেন নাকি ?
বললাম, কি খবর!
বর্তমানের ফুলটাইমার ঐ নেতার খবর:এই সরকারেরর সময় শেষ। তবে বিএনপি সরাসরি ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তবে,৫০:৫০ ফরমূলায় আমরা আছি। আমরা বিএনপি থেকে ৫০% আর আন্যান্য দল থেকে ৫০% প্রার্থি এবার সংসদে যাব। এমপি হবার জন্যই রাজনীতি করছি। এবার আর মিস নাই।
আমি বললাম এর বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু?
তার উত্তর, সময় হলেই বুঝতে পারবেন। তবে তার দেওয়া চরম সময় দু‘মাস আগেই পেরিয়ে গেছে।
 
বাংলাদেশ ন্যাশনাল এ্যালায়েন্স- বিএনএ ভূক্ত দু‘টি দলের দুই তরুণ নেতা জানালেন, ভাই, গতকাল গোপন মিটিং ছিলো কাউকে বলবেন না। আমরা আসতেছি। এই সরকারের বেস নাই। তারা ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে নিরাপদ এক্সিট-ওয়ে চায়। আর এজন্য তারা বিএনপিকে ছাড়া অন্য কারো হাতে ক্ষমতা দিয়ে যেতে চায়।
এই অন্যকারো-দের সাথেই আমরা যোগাযোগ রাখছি। আমরা ছাড়া আর আছে কে! ইনশাল্লাহ আগামী সংসদে আমরা যাচ্ছি।
বললাম,এই “অন্যকারা” কারা?
নেতাদ্বয় ভারিক্কিচালে বললেন,ভাই সব কথা বলা যাবে না। আমরা পলিটিক্স করি। সবই বুঝি।
একজন পরিচিত বাম-নেতা বললেন,অপেক্ষা করেন।পর্দার অড়ালে অনেক কিছই ঘটছে। সময় হলেই দেখতে পাবেন।
আসলে পর্দার আড়ালে কী ঘটছে?
রাজনীতিতে বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। কারণ এই দেশের গণতন্ত্র বড়ই ভঙ্গুর। অতীতের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
কিন্তু বর্তমান সরকার দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময় দক্ষতার সাথে সরকার চালিয়ে আসছে। এতটা স্ট্যাবিলিটি নিয়ে ক্ষমতার চেয়ার আগলে আর কাউকে আসীন থাকতে দেখা যায়নি।
 
রাজনীতি আসলে কৌশলের খেলা। এই কৌশলের খেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেত্রীর পায়ে বল। তাঁর কৌশলের কাছে ম্যারাডোনা-মেশি’রা ফেল! তিনি ইচ্ছেমতো রাজনীতির সারামাঠ জুড়ে খেলছেন, খেলাচ্ছেন। বলা চলে রাজনীতির মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছেন। আবার সময় হলে ইচ্ছে মতো গোল দিয়ে চলেছেন। লোক-দেখানোর জন্য প্রায় ভাড়াটে কিছুদল তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে খেলার অভিনয় করলেও খেলাটা যে এক তরফা তা সবারই জানা।
এই খেলাতে  যে দলের থাকার কথা। সেই বিএনপি কিন্তু মাঠে নেই। বঙ্গবন্ধু-কন্যা ছলে-বলে-কৌশলে বিএনপিকে মাঠছাড়া করে রেখেছেন।
বিএনপি ‘বক্সিং রিং’-এ পা ঢোকানোর চেষ্টা করলেও “মিল-মাসকারাস”এর মতো কিক মেরে বিএনপিকে নক-আউট করে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।
তাই একঅর্থে বলা চলে বিএনপি আসলেই মাঠে নেই। বলিষ্ঠ নেতৃত্বহীনতার কারণে দলটি আজ মাঠছাড়া। ছন্নছাড়া্ দিশাহারা।
বিএনপি আজ নিজে নিজেকেই যেন মাইনাস করে ফেলেছে।
আসলে বিএনপির এমনটা হবার কথা নয়। কিন্তু কেন হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে।
বঙ্গবন্ধু সপরিবার নির্মমভাবে নিহত হবার পর বাংলাদেশ নেতৃত্বের এক চরম সংকটে পড়েছিল। একটা রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছিল।
বিচক্ষণ সেনাপ্রধান মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়া তা উপলব্দি করে রাজনীতির মাঠে নামেন। নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে এক ঝাঁক ভালো ইমেজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে তিনি নতুন যে দল করে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল ও উন্নয়নমূখী করেছিলেন। সেই দলীয় জেনারেল স্টাফদের অনেকেই আজ  দলে নেই।
তাদের অনেকেই ইন্তেকাল করেছেন। নয় তো বিএনপি তাদের ঘর ছাড়া করেছে।
বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা.বদরুদ্দোজা চৌধুরী। জেনালের জিয়ার সহচর কর্ণেল ওলি(অ.) ও প্রতিষ্ঠাকালীন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির তরুণ সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আজ বিএনপিতে নেই।
বিএনপি তাদের ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতায় অনেক মাসুল দিয়ে চলেছে।
দেশের রাজনীতি মূলত ঢাকা-কেন্দ্রিক। তাই “ঢাকা যার, দেশ তার” এমনটা বলা চলে।  এই ঢাকাকে দখলে রাখতে অতীতে ঢাকা বিএনপি’র সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমূল হুদা বড় ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন আন্দোলন-বিক্ষোভে তার নির্বাচনী এলাকার হাজার হাজার কর্মী এসে   ঢাকার রাজপথ দখলে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। (চলবে)
 
 
আগের অংশ পড়তে পারেন
মাইনাস বিএনপি : হাওয়া থেকে পাওয়া-২
বি.এম. জুলফি
 
কেন বিএনপি নয়, তা জানার জন্য আমাদের একটু পিছন দিকে তাকাতে হবে।
মহান স্বাধীনতার পর নির্বাচন-বিমূখ ভাসানী ন্যাপ ছাড়া বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য কোনো দল ছিলো না। মূলত দ্বিজাতি-তত্বের উদ্ভাবক ও নেতৃত্বদানকারী এবং ভারত ভাগের মূল নিয়ামক দল মুসলিম লীগ তখন প্রায় অস্তিত্তহীন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় এক ধরণের রাজনৈতিক শূন্যতায় আওয়ামী লীগের কিছু যুবনেতা জাসদ তৈরী করে তৎকালীন  ক্ষমতাসীর রাজনৈতিক সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেও তারা পরবর্তীতে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গঠন করেন।
গণমানুষের মনের ভাষা পাঠকারী এই দলটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। মূলত আওয়ামী লীগ বিরোধী দেশের সব মানুষের মিলনস্থল হয়ে ওঠে বিএনপি। কারণ জেনারেল জিয়া হতাশ ও হতোদ্যম জাতিকে আশা ও নবউদ্যোমে উদ্দীপ্ত করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে জেনারেল জিয়া নিহত হলে বিচারপতি সাত্তারের হাত ঘুরে বিএনপির নেতৃত্ব এসে পড়ে জেনারেল জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে।
সাত্তার সরকারকে উচ্ছেদ করে ক্ষমতায় এসে জেনারেল এরশাদ তার পূর্বসুরী জেনারেল জিয়ার পথ ধরে আরও একটি দল গঠন করেন। বিএনপি’র একাংশ ভেঙ্গে জাতীয়পার্টি গঠন করায় বিএনপি ঐক্যবদ্ধ রাখতে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ বেগম জিয়াকে রাজনীতির মাঠে নামতে হয়। তবে তিনি কতটা সফল হবেন, তা ছিলো অনেকেরই সংশয়ের প্রশ্ন। কিন্তু বেগম জিয়া তার একরোখা ও জেদী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধেই শুধু করেননি।বরং বলা যায় মূলত তার নেতৃত্বেই এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। এমন কি সুবিধাবাদের-খেলা খেলা তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রীও এক সময় রাজনীতি হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে এরশাদের সংসদ থেকে পদত্যাগ করে বেগম জিয়ার আন্দোলনে শরীক হতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচার বিরোধী এই আন্দোলন ছিলো এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। এই আন্দোলনে বেগম জিয়ার আপোষহী কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি আপোষহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান।
কিন্তু সময় বদলায় এবং পেক্ষাপটও বদলে যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার এই আপোষহীন মানসিকতার করণেই দলটি বিভিন্ন সময় ভুলের চোরবালিতে পা ফেলে আটকে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপদজনক অবস্থায় পতিত হয়েছে।
বিএনপি নানান ভুলের মধ্যে চরম ভুলটি করে যখন সাবেক রক্ষীবাহিনীর কর্তা জেনারেল মইন ইউ আহম্মদকে সেনাবাহিনীর চীফ পদে আসীন করে। পরবর্তীতে এর মাসুল বিএনপিকে শোধ করতে হয় কড়ায়-গণ্ডায়।
আসলে রাজনীতি একটি কৌশলের খেলা। বিভিন্ন সময় আপোষ-মিমাংসা করে চলাই যেন রাজনীতি। এই খেলায় সর্বদা আপোষাহীন হলে চলে না। এই ভুলের ফাঁদে পড়েই বিএনপি বর্তমান রাজনীতিতে থেকেও যেন নেই।
অবস্থা এমন যে, বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক- তাতে আর কিছু যায় আসে না। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করবে, সরকার গঠন করবে ও শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনা করবে এবং তা করেও চলেছে। তাই বলা যায় বিএনপি বর্তমান সময়ে অপাংক্তেয় একটি দল। রাজনীতির পংক্তিতে তাদের স্থান নেই বললেই চলে। অথচ এই দলের বিশাল একটা রাজনৈতিক কাঠামো আছে। অসংখ্য অনুসারী-অনুরাগী আছে। তারপরও নেতৃত্বের সংকটে দলটি গতিহারা। দিশাহারা।
দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করে জেলাবদ্ধ করা হয়েছে। তিনি সর্তসাপেক্ষে বর্তমানে মুক্ত থাকলেও তার রাজনীতি করার অধিকার নেই। নির্বাসিত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আদালতে অভিযুক্ত, দণ্ডিত । তিনি দেশের মাটিতে তাই পা রাখতে পারছেন না। তাছাড়া দেশের বর্তমান অবস্থায় দেশে এলে তার নিরাপত্তা নিয়েও শংকা আছে বলে বিএনপি মনে করে। এমতাবস্থায় তিনি ভার্চুয়ালী তার দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার কোশেস করছেন। কিন্তু তা কোনোমতেই বেগবান হতে পারছেনা।
বাংলাদেশের এলিটফোর্স হিসেবে পরিচিত র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আমেরিকার স্টেট ডিপার্চমেন্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করায় সরকার কিছুটা রক্ষণাত্মক ভূমিকা নেয়। এতে বিএনপি অন্দোলনের একটা মওকা পেয়ে যায়। এপর্যায়ে বিএনপি বিভিন্ন ৫টি জেলা শহরে ১৪৪ ধারা ভেঙে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ করার মতো সাফল্য দেখায়। দলটি এমন কিছু আশাব্যাঞ্জক পারফর্মেন্স দেখাতে চেষ্টা করে কিছুটা সফল হলেও করোনার শেষ ঢেউয়ের লক-ডাউনে তাদের আন্দোলন বেগবান করার স্বপ্ন ভেসে যায়। এরপর বিএনপি আবারও সেই আগের অবস্থানে ফিরে গেছে।
এমতাবস্থায় দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটাতে দেশি-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা ও গোষ্ঠিী তৎপর বলে নানান সূত্রে খবরা-খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এসব সূত্রের খবর হচ্ছে, পরিবর্তন আসন্ন। তবে তা কি-ভাবে তা জানা না গেলেও বিএনপি সংশ্লিষ্ট মহলও এর সঙ্গে জড়িত বলে শোনা যাচ্ছে। এমন ক’জনের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। (চলবে)
 
 

সর্বশেষ সংবাদ

অন্তরালের খবর এর আরো খবর