ভারতে সাম্প্রদায়িকতা: বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতার বিতর্ক
জাইম ফারাজী

প্রায় হাজার বছর ধরে মুসলমানদের সাথে একত্রে বসবাস করলেও ভারতের কিছু মানুষের হিন্দু-মানসের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি তা স্পষ্ট। ভারত ভাগের সময় যে দ্বিজাতি-তত্ব সামনে এসেছিলো। তা কি আবারও বারবার সামনে আসছে!
সম্প্রতি ভারতের কর্ণাটকে হিজাব পরার জন্য এক মুসলিম শিক্ষার্থীকে কলেজে প্রবেশ করতে নিষেধ করায় যে বিতর্কের সূচনা হয় সেই বিতর্েেকর ঘোলাজল  স্বচ্ছ না হতেই ভারতের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক ইফতার মাহফিল নিয়ে ফের নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ।
খবরে প্রকাশ রমজান মাসে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতার পার্টি নিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় ক্যাম্পাসের ভিতর ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে স্বয়ং উপাচার্য যোগ দিয়েছিলেন।
কেন বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজ করবে তা নিয়ে সরব হয় তারা। উপাচার্যের কুশপুতুল পোড়ানোর পাশাপাশি উপাচার্যের বাড়ি ঘেরাও করে হনুমান চালিশা পড়ে তারা। 
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কিছু মানুষ আলোচনা শুরু করে। তাদের পোস্টে একাধিক সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কথাও উঠে আসে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। 
তাতে স্পষ্ট লেখা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় ওই পার্টির আয়োজন করেনি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক ও ছাত্র তাতে যোগ দিয়েছিলেন। এবং এটাই বহু যুগ ধরে বিএইচইউ'র সংস্কৃতি। ভবিষ্যতেও এই সংস্কৃতি ধরে রাখা হবে বলেও সেই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এবং আমা প্রকাশ করা হয়  যে, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সবার উৎসবে যোগ দিতে হবে। 
এখানেই শেষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে দেয়, প্রতিবাদীরা যে অভিযোগ করছে, তাতে একাধিক ভুয়া তথ্য আছে।
তবে অনেকে মনে করছেন যে,ওই ভুয়া তথ্য প্রচার করে আসলে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। ঘটনার সূত্রপাত বিএইচইউ-এর নারী মহাবিদ্যালয় উইংয়ে। সেখানেই ইফতারের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-সহ বহু শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীরা যোগ দিয়েছিলেন। তারপরেই প্রতিবাদে নেমে পড়ে হিন্দুত্ববাদী ছাত্র সংগঠনের একাংশের ছাত্ররা। উপাচার্যের বাড়ির বাইরে হনুমান চালিশা পড়তে শুরু করে তারা। উপাচার্যের কুশপুতুলও দাহ করা হয়। 
এ বছর ইফতার নিয়ে ভারতের দুইরকম ছবি সামনে আসছে। একদিকে চিরাচরিত সংস্কৃতি মেনে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে আনন্দ করছেন- এমন চিত্র যেমন আছে, তেমনই মুসলিম অনুষ্ঠানে হিন্দুরা কেন যোগ দেবেন, এই প্রশ্নও তোলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা পোস্ট ঘুরছে। তাতে হালাল মাংস, ঝটকা মাংস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ইফতারে যোগ দেওয়া নিয়ে কটাক্ষ করা হচ্ছে। 
তবে আশার কথা হচ্ছে যে,ভারতের অনেক মানুষআছেন যারা সম্প্রদায়িকতার উর্ধে উঠে সম্প্রীতির কথা বলে যাচ্ছেন এবং বএই চর্চা রাখার ব্যাপরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
যেমন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের এক ছাত্র বলেন, ‘বিএইচইউ-এর অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি আমরা নষ্ট হতে দেব না। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কোনো জায়গা নেই এখানে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রক্টর ভুবন চন্দ কাপরি বলেন, ‘এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই পার্টির আয়োজন করেনি। কিন্তু বরাবরই তারা এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অতীতে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও এতে অংশ নিয়েছেন। এই ঐতিহ্য বন্ধ করা হবে না।
দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগের দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর পরে ভারতের সাপ্রদায়িক রাজনীতি যেন নতুন করে জেগে উঠছে। 
ভারতে উগ্র সাপ্রদায়িক রাজনীতির উত্থানে ভারতের প্রাচীন দল ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেস ক্রমেই পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।এমতাবস্থায় অনেকেই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাতে উদ্যোগী হচ্ছেন। সম্প্রতি দিল্লীর আলোচিত আম-আদমী পার্টিও হিন্দুদের ভোট-টানতে হিন্দুত্ববাদের ট্রাম্পকার্ড নিয়ে খেলা করায় ভারতের রাজনীতির ঈশানকোনে নতুন করে অশনি-মেঘ জমছে বলে অনেক রাজনীতির বিশ্লেষক মনে করছেন। এমনটা জাতি হিসেবে ভারতের জন্য গৌরবের বিষয় হবে না।
 
 
 

সর্বশেষ সংবাদ

অন্তরালের খবর এর আরো খবর