মাথাপিছু আয় যখন ২,৮২৪ ডলার
হযরত আলীদের মাথাপিছু আয় কত?
জাইম ফারাজী

হযরত আলীর তহবিল মাত্র ১৫০০টাকা।সকাল সকাল কাওরান বাজার থেকে ভারে করে দুই টুকরি কাঁচা-পাকা আমলকি,তেতুল,লেবু,পানিফল কিনে এনে বসে পড়েন মগবাজারের দীন হাসপাতালের গলিতে।দিন গেলে ৫/৬শ টাকা লাভ হয়।তাই দিয়ে চলে তার ছয়জনের সংসার।ঢাকায় তার ঠিকানা ফুটপাত আর আসল ঠিকানা জামালপুর।সেখানে চার সন্তানসহ তার স্ত্রী বাস করেন।সবার  জন‍্য দৈনিক মাথাপিছু বরাদ্দ একশ টাকা ধরলে মৌলিক চাহিদার কতটুকু পূর্ণ হয়!
গত মে মাসে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান একনেক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান এ বছর মাথাপিছু আয় ২৩৩ ডলার বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছর যা ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসএর সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৭০ টাকা বা ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৮ টাকা বা ২ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে শতকরা ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। 
জিডিপির মোট আকার ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কৃষি খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে শতকরা ২ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে শস্য উপখাতে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, পশুপালন উপখাতে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ, বন উপখাতে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মৎস্য খাতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শিল্প খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ছাড়া বছর সাময়িক হিসাবে বিদ্যুৎ খাতে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে শিল্প খাতে গত বছরের (২০২০-২১) তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে।
পরিকল্পনামন্ত্রী  আরও যোগ করেন,সেবা খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে পাইকারী ও খুচরা ব্যবসা খাতে ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ, যানবাহন খাতে ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, ব্যাংক ও বীমা খাতে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ, শিক্ষা খাতে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ ও স্বাস্থ্য খাতে ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে সেবা খাতে বগত বছরের (২০২০-২১) তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে।
তবে বৈষম্যের কারণে গাল ভরা মাথাপিছু আয়ের তথ্যকে নিষ্ঠুর রসিকতার মতো লাগে সাথারণ মানুয়ষের কাছে।
 
 
 তাই অনেকেই কটাক্ষ করে বলছেন যে, যে আয় মানুষের মাথার পেছন দিকে থাকে, যার ফলে সেই আয় মানুষ আর দেখতে পায় না, তাকেই মাথাপিছু আয় বলা হয়ে থাকে।
পরিকল্পনামন্ত্রীর দাবী, মানুষের কেনাকাটা অনেক বেড়েছে। গ্রামে গেলেই দেখা যায়, মানুষ কেনাকাটা করছে। তার মানে মানুষের আয় বেড়েছে। হতে পারে কারো কম বেড়েছে কিংবা কারো বেশি। তবে আয় বেড়েছে। মানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বৈষম্যের কারণে এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায় মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশের মানুষের প্রকৃত আয় কতটা বেড়েছে তা অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ।
তাই সরকার মাথাপিছু আয় বেড়েছে বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট ছিল ০.৪৮২, যা ২০১০ সালে ছিল ০. ৪৫৮। গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট যত বাড়বে, বৈষম্য তত বাড়ছে বলে বোঝা যাবে। বর্তমানে দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তাহলে সর্বকালের সর্বোচ্চ।
দেশের আয় বৈষম্য যে বেড়েছে, সেটি খুব ভালোভাবেই সরকারের মাথাপিছু আয়ের তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। আর এ জন্যই মানুষ মাথাপিছু আয়ের তথ্যের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না।
অপরদিকে মাথাপিছু আয় বাড়লেই সব মানুষের আয় সমানভাবে বাড়বে, বিষয়টি তেমন নয়। যেহেতু এটি গড় হিসাব করে বের করা হয়, সুতরাং কারো আয় অনেক বাড়লেও মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে। আর সেক্ষেত্রে মানুষ এই তথ্যের সঙ্গে মিল খুঁজে নাও পেতে পারেন।
যেহেতু বৈষম্য বেড়েছে এবং সার্বিক দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, তাই অনেকের কাছে এই তথ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ।  
করোনা মহামারির কারণে মানুষের আয় কমায় বৈষম্য বেড়েছে প্রায় সারা বিশ্বেই। আর দেশে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে।
যেহেতু মাথাপিছু আয় মানে হলো গড় আয়, সুতরাং এটি সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা দেখায় না। বরং এই মাথাপিছু আয়ের আবরণের নীতে শোষণ-বৈষম্য আরও প্রকটভাবে চলমান থাকে।
তাই মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির সূচকে তৃপ্তিকর মনে করা হলেও বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে তা অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তীব্র শোষণের মানই নির্দেশ করছে।
কারণ কারো আয় ৩০০ ডলার আর কারো আয় ৩০,০০০ ডলার হলে শুভঙ্করের এই ফাঁকি দিয়ে মানুষকে আর কত বোকা বানানো হবে!
 

সর্বশেষ সংবাদ

মানবাধিকার এর আরো খবর