নজরুলের উপন্যাস
বোরহান উদ্দিন আহমদ :


অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত আমাদের জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে আবির্ভাব গদ্য রচয়িতা হিসেবে। ৪৯নং বাঙালি পল্টনের হাবিলদার হিসাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কর্মরত অবস্থায় তার প্রথম সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয় ‘বাউণ্ডুলের আত্মকথা’ নামের গদ্য রচনার মাধ্যমে। এটাকে আমরা ছোট গল্প বলতে পারি। এটা পরে নজরুলের ছোট গল্প সংকলন রিক্তের বেদনে দ্বিতীয় ছোট গল্প হিসেবে স্থান পেয়েছে। নজরুলের ছোট গল্প, উপন্যাস, পত্রিকার সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, পত্রাবলি ও ভাষণ পাঠ করলে গদ্যলেখক হিসেবে নজরুলের শক্তিমত্তার পরিচয় পেয়ে আমরা চমত্কৃত হই। এ প্রবন্ধে সব্যসাচী এ অমর লেখকের উপন্যাস সম্বন্ধে কিছুটা আলোকপাত করব।

বাঁধন-হারা, মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা—নজরুলের মোট এ তিনটি উপন্যাস আমাদের হাতে এসেছে। ঢাকার নজরুল ইনস্টিটিউটকে অসংখ্য ধন্যবাদ, তারা ১৯৯৫ সালে নজরুলের ‘উপন্যাস সমগ্র’ পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে আষাঢ় ১৪০৪ তথা জুন ১৯৯৫ সালে।

প্রথমে বাঁধন-হারা উপন্যাসের কথা। ‘বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস ‘বাঁধন-হারা’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় শ্রাবণ ১৩৩৪ (১৯২৭)। কিন্তু এর প্রায় সাত বছর আগে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রথম সংখ্যা থেকে উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।’ ( দ্রষ্টব্য : চতুর্থ সংস্করণের প্রসঙ্গ-কথা, নজরুলের উপন্যাস সমগ্র)। উপন্যাসের নায়ক নুরুল হুদা (নুরু)। উপন্যাসের লেখক নজরুল ইসলাম। নায়ক নুরুল হুদা আর ঔপন্যাসিক নজরুল যে একই মানুষ, সেটা সচেতন পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না।

পিতৃ-মাতৃহীন নুরুল হুদাকে রবিয়লের আবিষ্কার, তার বাড়িতে তাকে স্নেহভরে ও বন্ধুভাবে নিয়ে আসা এবং আশ্রয় দান, তার স্ত্রী রাবেয়ার স্নেহ, তার শ্যালক মনুর সঙ্গে তার গভীর সখ্য, তার ছোট বোন সোফিয়ার সই প্রতিবেশী মাহবুবার সঙ্গে নুরুল হুদার প্রণয় ও পূর্বরাগ, নুরুল হুদা ও সুন্দরী মাহবুবার প্রণয়দৃষ্টে ভাবীর ও রবিয়লের মধ্যস্থতায় বিয়ে সব ঠিক-ঠাক এবং তারপর রহস্যজনক কারণে বাঁধন-হারা নুরুর কাউকে কিছু না বলে সে বিয়ে ভেঙে দিয়ে সেনাবাহিনীর কাজে যোগদান করে দূরে চলে যাওয়া, এতে মাহবুবার বাবার মন ভেঙে যাওয়া ও মৃত্যু—এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে গেছে। নুরুর প্রেমিকা পিতৃহীনা অপরূপা সুন্দরী মাহবুবার বিয়ে হয় এক বৃদ্ধ জমিদারের সঙ্গে। শিগগিরই মাহবুবা বিধবা হয়। কিন্তু সে উত্তরাধিকার সূত্রে পায় জমিদারি। বাঁধন-হারা নুরুর নীরব হাহাকার আর বেদনার মাঝে সেনাবাহিনীর জীবন শেষে প্রত্যাবর্তনের আভাসের মধ্য দিয়ে কাহিনীর সমাপ্তি।

প্রথম পত্র থেকেই সৈনিক জীবনের অসামান্য বর্ণনারস ও হিউমারের মাধ্যমে পাওয়া যায়। আবেগঘন কাহিনীর মাঝে এই রস ও হিউমার উপন্যাসটিকে আকর্ষণীয় করে। সৈনিকের জীবনের কিছু আনন্দ ও অনেক বেদনার গল্প শুনিয়েছেন ঔপন্যাসিক দরদের সঙ্গে।

নুরু ও মাহবুবার ভালোবাসা, বিয়ে অজানা রহস্যজনক কারণে ভেঙে দিয়ে বাঁধন-হারা নুরুর দূরে সেনাবাহিনীতে চলে যাওয়া, তবু নুরুর সেই ভালোবাসার ব্যথা বয়ে চলা, নুরুর জন্য সোফিরও গোপন না-বলা ভালোবাসা, কেউ কাউকে না পাওয়া, হাহাকার—এমনই অনেক ব্যথার ছবি ঔপন্যাসিকের সংবেদনশীল লেখনী যা ফুটিয়ে তুলেছে, তা আমাদের আপ্লুত করে। বিচ্ছিন্ন পত্রের মাধ্যমে উপন্যাস সৃষ্টির অভিনব টেকনিকের সার্থক প্রয়োগ উপন্যাসটিতে হয়েছে।

বাঁধন-হারা উপন্যাসের বাঁধন অনেকটা শিথিল উপন্যাসের মতো। চরিত্রে হয়তো কোনো মহত্ শিল্পের রেখাপথ ধরে নির্দিষ্ট পথে পৌঁছার চেষ্টা নেই। অজস্র কথার ভিড়ে, বর্ণনার বাহুল্যে এক-একটি ব্যক্তিত্বের অস্পষ্ট গুঞ্জনমাত্র শোনা যায়। তাতে উপন্যাসের রস আস্বাদনে কোনো ব্যাঘাত বা ব্যত্যয় ঘটে না। অন্যান্য চরিত্র অস্পষ্ট ও স্বাতন্ত্র্যবর্জিত হলেও কোনো কোনো চরিত্রের টানাপড়েন, বিশেষ করে নায়ক ও তার প্রেমিকার, আমাদের ভাবায় ও কাঁদায়। ঔপন্যাসিকের আন্তরিকতায় উপন্যাসের পরিণতি আমাদের মন ছুঁয়ে যায়।

এর পরের উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’। উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ বৈশাখ ১৩৩৭ (১৯৩০ সাল)। নজরুল যে ক’টি উপন্যাস রচনা করেছেন, তার মধ্যে শিল্পাঙ্গিক ও জীবনবোধের সফলতায় মৃত্যুক্ষুধা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। পশ্চিমবঙ্গে কৃষ্ণনগরের চাঁদ সড়কের নিম্নশ্রেণীর দরিদ্র হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টান সম্পদায়ের দারিদ্র্য ও দুঃখভরা জীবন নিয়ে উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। তাদের একদিকে মৃত্যু আর একদিকে ক্ষুধা। সেখান থেকেই উপন্যাসের নামকরণ মৃত্যুক্ষুধা। তারা অভাবের কারণে ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করে। আবার পরস্পরের দুঃখে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ায়।

কাহিনীর শুরুতে কলতলায় হিন্দু হিড়িম্বার ও মুসলমান গজালের মায়ের ঝগড়ার মাধ্যমে এক প্রধান চরিত্র গজালের মায়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। তার তিন ছেলে মারা গেছে যৌবন বয়সে, রেখে গেছে তিন বিধবা স্ত্রী (বড় বউ, মেজো বউ ও সেজো বউ) আর তাদের প্রায় একডজন ছেলেমেয়ে। ছোট ছেলে প্যাঁকালে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। এর মধ্যে স্বামীর ঘর ছেড়ে আসা ছোট মেয়ের প্রসববেদনা শেষে ছেলের জন্ম হয়। শত দুঃখের মাঝেও সে এক আনন্দ। এমনি করে অনেক দুঃখ আর মাঝে মধ্যে ছোট ছোট আনন্দের মধ্যে কাহিনী এগিয়ে চলে। এই দরিদ্র পরিবারের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা, বিশেষ করে দাদির মমতা আমাদের আনন্দ দেয়। রুগ্ণ সেজো বউয়ের মৃত্যু আমাদের ব্যথাতুর করে।

প্যাঁকালে আর খ্রিস্টান মেয়ে কুর্শির প্রেম আমরা দেখি। বিধবা মেজো বউ অপরূপা সুন্দরী। তার বড় বোনের স্বামী ঘিয়াসুদ্দীন তাকে বিয়ে করতে খুবই আগ্রহী। খ্রিস্টান মিশনারিদের সাহায্যের আড়ালে ধর্মান্তকরণের প্রয়াস দেখি। মেজো বউ শেষে খ্রিস্টান হয়ে যায়। তার নাম হয় হেলেন। তার প্রেম হয় বিপ্লবী নেতা আনসারের সঙ্গে। সে আবার মুসলমান হয়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য আনসারের কারাবরণের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি। উপন্যাসের চরিত্রগুলো অসাধারণ মমতায় এঁকেছেন ঔপন্যাসিক। বাস্তব জীবনের আলেখ্য অসহায় দরিদ্রদের জীবনের আনন্দ-বেদনা নিয়ে মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস এক অপরূপ সৃষ্টি। নজরুলের উপন্যাস-চিন্তার সর্বশেষ ভাষ্য ‘কুহেলিকা’। গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে ১৩৩৪ (১৯২৭) সালের ‘নওরোজ’ পত্রিকার পাঁচটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে সাপ্তাহিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় উপন্যাসটির বাকি অংশ প্রকাশিত হয়। তরুণ কবি হারুনের মেসে তার ‘নারী কুহেলিকা’ মতের ওপর তার সঙ্গীদের মজার বিতর্কের মাধ্যমে কাহিনীর শুরু। এ নারীকে নিয়েই উপন্যাসের কুহেলিকা নামকরণ। এ সঙ্গীদের মধ্যে জাহাঙ্গীর যে স্বদেশ-মন্ত্রে দীক্ষিত ও দেশ উদ্ধারের জন্য বিপ্লবী সংঘের সদস্য, তার কর্মকাণ্ড, তার সঙ্গীদের, তার জীবনের নারী চম্পা, ভুণী—এদের নিয়ে উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে চলে। জাহাঙ্গীরের দ্বীপান্তরে উপন্যাসের সমাপ্তি। উপন্যাসে লেখকের নিজস্ব জীবন-দর্শন ও বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখি। এ উপন্যাসে সে যুগের যুব-মানসের রক্তচাঞ্চল্য অনুভব করা যায়। উপন্যাসের রূপকর্ম সম্পর্কে বলা যায়, ‘কুহেলিকা’ সাময়িক উপন্যাসের গোত্রভুক্ত হলেও কাহিনী পরিচর্যায় লেখকের মুনশিয়ানা রয়েছে। ভাষা এখানে যেমন ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও প্রাণের স্পর্শে জেগে উঠেছে, তেমনি বর্ণনারীতিতেও একটি মিথ-কথনের প্রয়াস দেখি। কবিত্বময় ভাষা এখানে স্বাস্থ্য আর লাবণ্যে বেশ দ্যুতিময়।

নজরুলের উপন্যাসের অধিকাংশ বাক্য ছোট ছোট—অনেকটা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মতো। এদিক থেকে নজরুল হুমায়ূন আহমেদের পূর্বসূরি। প্রথম লাইন থেকে নজরুলের উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় এবং পাঠককে কৌতূহলী করে তোলে। পাঠক তার উপন্যাসের গল্পে নিমগ্ন হয়। মাঝে মধ্যেই তার উপন্যাসের বাক্যাবলি উজ্জ্বল কৌতুকের রস ছড়ায়। তার উপন্যাসে সমাজ সচেতনতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দরদ, নরনারীর প্রেমের প্রতি দরদি মনোভাব আমাদের মুগ্ধ করে। এসব দিক থেকেও নজরুল নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদের পূর্বসূরি। মাত্র তিনটি উপন্যাস রচনা করলেও নজরুলের উপন্যাস সমাজের, দেশের, মাটির ও মানুষের কাছাকাছি—বিশেষ করে মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস। কাহিনী বৈচিত্র্য, ভাষা ও রচনাশৈলীতে নজরুলের উপন্যাসগুলো অসাধারণ। নিঃসন্দেহে নজরুল সমাজ-সচেতন, ইতিহাস-সচেতন, দেশপ্রেমিক, দরদি ও কুশলী ঔপন্যাসিক। নজরুলের উপন্যাসের আরও জোরদার পঠন, পাঠন ও এসবের ওপর গবেষণা অপরিহার্য।- আমার দেশ

তথ্যপঞ্জি :

১. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুলের উপন্যাস সমগ্র, নজরুল ইনস্টিটিউট, ষষ্ঠ সংস্করণ, অষ্টম মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১২

২. মো. এরসাদ হোসেন, এনডিসি, নির্বাহী পরিচালক, নজরুল ইনস্টিটিউট, চতুর্থ সংস্করণের প্রসঙ্গ-কথা, নজরুলের উপন্যাস সমগ্র, নজরুল ইনস্টিটিউট, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

বিডি ইউএসএ নিউজ২৪.কম/সো/১২ জুলাই ২০১৪

সর্বশেষ সংবাদ