মাঝরাতে মাঝ নদীতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল ৩৯টি প্রাণ:কবে বন্ধ হবে এই অনাচার

অনিয়মিই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশে।নইলে ভুল ডিজাইনের লঞ্চ অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছাড়াই কীভাবে নিয়মিত চলাচল করে! লঞ্চটির লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল ২০২১এর জানুয়ারি পর্যন্ত। তবে এতোদিন কীভাবে লঞ্চটি নৌরুটে নিয়মিত চলাচল করছিলো!
বিদগ্ধজনরা জানেন যে,কোনো জাহাজ ডুবতে গেলে সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন শেষপর্যন্ত জাহাজ ত্যাগ করতে পারেন না। যেমন যাত্রীবাহী বিমানের পাইলটরাও বিমান ফেলে প্যারাসুটে নেমে যেতে পারেন না। কারণ তারা কাণ্ডারী, তাদের দায়িত্ব সব যাত্রীকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার।
কিন্তু ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামের লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের পর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না নৌযানটির মাস্টার, সারেং, সুকানির! তাঁরা পালিয়ে গেছেন বলে দাবি বেঁচে ফেরা যাত্রীদের। এমনকি লঞ্চের কর্মচারীদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। 
যাত্রীদের অভিযোগ, আগুন লাগার ১৫ মিনিট পরে নদীর পাড়ে নিয়ে থামান লঞ্চের মাস্টার। কিন্তু যাত্রীদের ঝুঁকিতে ফেলে লঞ্চের মাস্টার, সারেং, সুকানিসহ সব কর্মচারী পালিয়ে যান। ওই সময় কয়েক শ যাত্রী নামতে পারলেও লঞ্চে থেকে যান ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা।  
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেসার্স নেভিগেশন কোম্পানির এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটির ধারণক্ষমতা দিনে ৭৬০ জন। তবে রাতে তা কমে হয় ৪২০ জন। এ ছাড়া লঞ্চটির লাইসেন্সের মেয়াদও ছিল ২০২১এর জানুয়ারি পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় লঞ্চটি ২৫ জন কর্মচারীসহ ৩১০ জনের ভয়েস ক্লিয়ারেন্স দিয়ে টার্মিনাল ত্যাগ করে।  
দেশের সকল গণমাধ্যমে বিগত ক’দিন ধরে আলোচিত মর্মান্তিক ঘটনা ঝালকাঠির সুগন্ধা বিষখালী নদীর মোহনায় ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। এতে অন্তত ৪০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন আরও শতাধিক। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের তথ্যমতে, দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ রয়েছেন ৬০ জনের বেশি। নিখোঁজের বড় অংশই শিশু ও নারী।গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।দুর্ঘটনার পর সুগন্ধা পাড়ে এখনও শুধুই পোড়া গন্ধ ও স্বজনদের আহাজারি। 
বিভিন্ন সূত্রমতে যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়েই ঢাকা থেকে বরগুনার উদ্দেশে যাত্রা করে অভিযান-১০ নামক লঞ্চটি। বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী অতিক্রমকালে দিয়াকুল নামক স্থানে যাত্রীরা লঞ্চের ইঞ্জিন রুমে বিকট শব্দ শুনতে পান। তখন অধিকাংশ যাত্রী গভীর ঘুমে। চোখ খুলেই দেখেন চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। মুহূর্তে লঞ্চের মধ্যে আগুন ধরে যায়। আগুন নিয়েই লঞ্চটি চলতে থাকে। লঞ্চটি পাড়ে আসার আগেই অগ্নিদগ্ধ হন অনেকে। তিন ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা লঞ্চ থেকে প্রাণ বাঁচাতে শীতের রাতেই অনেকে নদীতে ঝাঁপ দেন। শিশুদের নিয়েও নদীতে ঝাঁপ দেন কেউ কেউ। নদীতে লাফিয়ে পড়া অনেক যাত্রীকে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর মা-বাবার হাত থেকে ছুটে হারিয়ে গেছে অনেক শিশু। বিআইডব্লিউটিএর তথ্যানুযায়ী- অভিযান-১০ লঞ্চে ২৮০ জন যাত্রী ও ২৫ জন স্টাফ ছিল। তবে লঞ্চের যাত্রীরা দাবি করেছেন, পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ছেড়ে আসে। পথে কিছু যাত্রী নেমে যায়, কিছু যাত্রী নতুন করে লঞ্চে ওঠে। কানায় কানায় পূর্ণ ছিল লঞ্চের সবগুলো ডেক।
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’র কাছে অগ্নিকান্ডের খবর আসার পর তাদের কর্মীরা ৩টা ৫০ মিনিটে সেখানে পৌঁছে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের চেষ্টায় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা, কোস্ট গার্ড ও পুলিশ সদস্যরাও উদ্ধার অভিযানে সহযোগিতা করেন।শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দগ্ধ মোট ৭৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় চারজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ঝালকাঠি, বরগুনা ও বরিশালের বিভিন্ন হাসপাতালে। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে অগ্নিদগ্ধদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর অনেক রোগীকে নিয়ে আসা হয়েছে ঢাকায়। পরে শেরেবাংলা মেডিকেলে অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসার সেবা চালু করলেও তা অপ্রতুল।
এই দুর্ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটি ও জেলা প্রশাসনের মোট ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, আগুন লাগার পর অন্তত এক ঘণ্টা অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় লঞ্চটি চলছিল বলে জানিয়েছে নৌপুলিশ।  রাত সাড়ে ৩টার দিকে লঞ্চটি নলছিটি ক্রস করার সময় ইঞ্জিনে আগুন লাগে। কিন্তু লঞ্চটি নলছিটিতে স্টপেজ দেয়নি, ঝালকাঠিতেও স্টপেজ দেয়নি। লঞ্চটি প্রায় ১ ঘণ্টা অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় চলতে থাকে। পরবর্তীতে ইঞ্জিনের আগুন সম্ভবত তেলের ট্যাংকিতে লাগে এবং বিকট শব্দে লঞ্চটি ঘটনাস্থলে এসে থেমে যায়। চালক বা ইঞ্জিনের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের গাফিলতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করান হচ্ছে।
জীবন বাঁচাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে শীতের গভীর রাতে ঝাঁপ দেন বহু মানুষ। তাদের অনেকে বেঁচে ফিরেছেন। এখন হাসপাতালে ভর্তি। আবার সন্ধান মেলেনি বহু মানুষের।
ঝালকাঠিতে যাত্রীবাহী লঞ্চে অগ্নিকান্ডে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ও লাশ দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে আরও ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী।
সবচেয়ে ভয়ংকর খবর হচ্ছে লঞ্চ নাকি ছিল না আগুন নেভানোর  কোনো ব্যবস্থা!ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে। নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকার পরও লঞ্চের আগুন কেন নেভানো সম্ভব হয়নি, কেনই বা এত প্রাণহানি- এসব প্রশ্ন উঠে আসছে বারবার। কেউ কেউ এমভি অভিযান-১০-এর সার্ভে সার্টিফিকেট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ পুরো ঘটনাটি রহস্য আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, নদীতে থাকা লঞ্চে এত সময় ধরে আগুন জ্বলেছে, দগ্ধ মানুষের আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও তা নেভাতে তেমন তৎপরতা চোখে পড়েনি। বিভিন্ন সময় লঞ্চ দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ না দেখা এবং বিশেষজ্ঞদের মত বাস্তবায়ন না হওয়াকেও দুষছেন অনেকে।
আমাদের দেশে লঞ্চে অতীতেও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে এত ভয়াবহ ঘটনা কখনো ঘটেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় সবকিছু তদারকি করা হয়েছিল কি না ! অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না? যন্ত্র থাকলেই তো হবে না। সেগুলো কার্যকর ছিল কি না তা-ও দেখতে হবে। একই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত লোকজন ছিল কি না লঞ্চে? আবার সর্বশেষ কবে ফায়ার ড্রিল হয়েছে এসব সবই অজানা।
 অতীতের বিভিন্ন দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় ‘তদন্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়ন না করলে তদন্ত করিয়ে লাভ কী? যারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তিনি যে পর্যায়ের লোকই হোন না কেন। অন্যদিকে শুধু বিধিমালায় রাখলে হবে না। এর বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে দরকার নিয়মিত তদারকি। ঘটনাটি কিছুটা রহস্য মনে হয়েছে। কারণ এত সময় ধরে আগুন জ্বলল কিন্তু তা নেভানো সম্ভব হলো না কেন? অথচ মানুষ আগুনের ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়েছে। অতীতেও যে নৌপথে আগুনের ঘটনা ঘটেনি, তা নয়। কিন্তু সেগুলো নেভি বা কোস্টগার্ডের সদস্যরা অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছিলেন। লঞ্চের স্টিল তো এভাবে পোড়ার কথা নয়। তাহলে কেন এত পুড়ল? লঞ্চের বডি কেমন ছিল, তা ব্যবহার-উপযোগী কি না গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করি।
 অনেকেই বলছেন ইঞ্জিনে নাকি সমস্যা ছিল। আরেকটা বিষয় হলো, আগুনের ঘটনা ঘটলেও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের সাহায্যে ক্রুদের তা দ্রুত নিভিয়ে ফেলার কথা। তবে প্রশ্ন হলো, তারা আগুন নেভাতে ব্যর্থ হলেন কেন? ক্রুরা প্রশিক্ষিত ছিলেন কি না? লঞ্চের পেইন্ট কেমন ছিল? অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রগুলো কাজ করেছে কি না, আবার বহির্গমন দরজা কি পর্যাপ্ত ছিল? এসব প্রশ্নরউত্তর খুঁজতে হবে।
লঞ্চের সার্ভে সার্টিফিকেট সঠিক ছিল কি না, না থাকলে জড়িত প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা বলতে চাই, পেশাদারদের দিয়ে তদন্ত করানো হোক। সত্যিকারের কারণ খুঁজে বের করতে হবে।এবং একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উঠে আসা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। সেইফটি প্রটেকশন নিশ্চিত না করে কোনো যানবাহনকেই নামতে অনুমতি না দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। 
বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পেছনে নয়টি কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। গত বছর ২৯ জুন বুড়িগঙ্গায় দুই লঞ্চের সংঘর্ষে ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়। এ ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির সুপারিশ কাগজে কলমেই রয়ে গেছে !
ইতোমধ্যে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।এসব তদন্তকমিটির রিপোর্ট যদি আবারও ওমন করে পড়ে থাকে,তবে কাজের কাজ কিছুই হবেনা।আবারও দুর্ঘটনা ঘটবে এবং আবারও নিরিহ মানুষের মৃত্যু দেখতে হবে এবং আহাজারী আমাদের শুনতে হবে।
স্বাধীনতার পর ৫০ বছর পেরিয়ে গেল। কবে আমাদের বোধোদয় হবে।জনতার পয়সায়,জনতার খেয়ে জনতার জন্য কাজ করার শপৎ নিয়েও জনতার জানমাল নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের এমন ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতেই হবে। নইলে নিহতদের আত্মা কখনো শান্তি পাবে না।এবং আহতদের আভিশাপ আমাদের ধ্বংশের পথেই নিয়ে যাবে।
 

সম্পাদকীয় এর আরো খবর