স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ
গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রত্যাশা আবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন

মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সুবর্ণ সময় অতিমারী কোভিড-১৯ এর আবহে অনেকটা নিরানন্দভাবে বয়ে চলেছে। তবে স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে জাতির অর্জন একবারেই কম নয়। কৃষি,শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দেশ এগিয়েছে অনেক দূর। কেন্দ্রিয় ব্যাঙ্কের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়নস ডলারে। যে দেশ একসময় ঋণের থালা নিয়ে বিভিন্ন দাতা সংস্থার দুয়ারে ধর্ণা দিতো ঋণের জন্য. তারা আজ অন্য রাষ্ট্রকে ঋণ দেবার চিন্তা ভাবনা করে।
কৃষি-উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫গুণ। শিল্প উৎপাদন প্রায় ১৫গুণ। আর অবকাঠামোগত উন্নয়নও বিশ্ময়কর না হলেও অপ্রতুল নয়।
সারা বাংলাদেশের গ্রাম-জনপদ ছাড়াও সড়ক-মহাসড়কের যে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরী হয়েছে তা উন্নয়নের বড় সহগ হিসেবে কাজ করছে।
স্বাধীনতার পর আমুল বদলে গেছে দেশের আদিগন্ত ভূমি। বহুল প্রত্যাশিত যমুনা সেতুর পর বহুলপ্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু আজ বাস্তব।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার হয়ে আগামী বছরে তিনটি মেগা প্রজেক্ট উদ্বোধনের প্রতীক্ষায় জাতি। আর তা হচ্ছে আগামী জুনে পদ্মা সেতু। এরপরে কর্ণফুলী নদীর নীচের টানেল পথ ও বছর শেষে স্বপ্নের মেট্রোরেল লাইন-৬ উদ্বোধন হবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
 
বাংলাদেশ স্বাধীনতা–পরবর্তী ৫০ বছরে ১৩টি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে।
এক্ষেত্রে সরকারগুলোর নীতি-সিদ্ধান্ত যতটা না ভূমিকা রেখেছে, তার চেয়ে বেশি ভুমিকা রেখেছে উদ্যমী সাধারণ মানুষ। উদ্যোক্তারা শত বিপত্তির মুখেও ব্যবসা–বাণিজ্য ও শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বেসরকারি খাতনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে উত্থান ঘটেছে, তাতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের মতো বড় দেশের পরেই আসে বাংলাদেশের নাম। কিছু ক্ষেত্রে তো চীন-ভারতকে পেছনে ফেলে প্রথম অবস্থানে পৌঁছেছে বাংলাদেশ।
ভাতই বাঙালির প্রধান খাদ্য। স্বাধীনতার পর যখন মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি, তখন দেশে খাদ্যসংকট ছিল। তখন চালের উৎপাদন ছিলো প্রায় এককোটি পাঁচ লাখ মেট্রিকটন মাত্র ! সেই বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ অনেক কমে যাওয়ার পরও আজ ধান উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা যায় যে, দেশে গত ২০১৯–২০ অর্থবছরে ৫ কোটি ২৬ লাখ টন ধান উৎপন্ন হয়েছে, যা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। চীন ১৪ কোটি ৮৫ লাখ টন উৎপাদন করে আছে প্রথম স্থানে, আর ভারত ১১ কোটি ৬৪ লাখ টন উৎপাদন করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। গত ২০১৯–২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বিশ্বের মোট পোশাক রপ্তানির ৬.৮ %। পোশাক রপ্তানিতে প্রথম হচ্ছে চীন৩০.৮ %। তৃতীয় অবস্থানে আছে ভিয়েতনাম৬.২%।
এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন, যাঁদের বেশির ভাগই শ্রমিক। তারা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ তাঁরা দেশে পাঠান মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-পুত্র-পরিজনদের কাছে। প্রবাসী আয় আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান  এখন অষ্টম। গত অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। একই অর্থবছরে ভারত ৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার নিয়ে প্রথম এবং ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার পেয়ে চীন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। 
একসময়ের ‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। উৎপাদনের পরিমাণ ১৩ লাখ ৩৫ হাজার টন, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৪২ শতাংশ। প্রায় ২০ লাখ টন উৎপাদন করে প্রথম ভারত। ভারতে হয় বিশ্বের ৫৫ শতাংশ উৎপাদন। ৪৫ হাজার টন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে চীন।
তবে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম বাংলাদেশ। পাট দিয়ে ২৮৫ ধরনের পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
 
মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়।এফএওর মতে, দেশে মিঠাপানির মাছ উৎপাদন হয় বিশ্বের মোট উৎপাদনের ১০ %। প্রথম চীন ১৬ % ও  ভারত দ্বিতীয় ১৪ %।
এফএও মতে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম বাংলাদেশ। গত ১০ বছরে মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। আর মাছ রপ্তানি বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি।
শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা ফ্রিল্যান্স বা আউটসোর্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন এখন। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাতে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ছয় লাখ, যা শতকরা হারে বিশ্বের প্রায় ২৭ %। বদৌলতে বাংলাদেশ এ খাতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যায় প্রথম হচ্ছে ভারত।
সারা বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশই বাংলাদেশে হচ্ছে, যা পরিমাণে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন। তবে ইলিশ উৎপাদন ৭ লাখ টন হওয়াও সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। ইলিশ উৎপাদনে ভারত দ্বিতীয়, মিয়ানমার তৃতীয়।
এমনিভাবে গরু ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দুই দেশ হচ্ছে ভারত ও চীন।
সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। বছরে উৎপাদন হয় ১ কোটি ৬০ লাখ টন।
আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ষষ্ঠ। গত অর্থবছরে আলু উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টন।
কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে। বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ ১০ লাখ টন।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বে আম উৎপাদনে অষ্টম। বছরে উৎপাদন হয় ২৪ লাখ টন।
১০ লাখ ৪৭ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদন করে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম স্থানে।
এমন অনেক অর্জন আমাদের আনন্দিত করে। তবে মহান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়নের সূচকে এগিয়ে গেলেও গণতন্ত্রের উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ে আছে। গত ৫০ বছরে দেশে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে গণতন্ত্রকে পদদলিত করেছে আবলীলায়!
‘জনতার জন্য, জনতার দ্বারা, জনতার সরকার’র গণতন্ত্রের সংজ্ঞাকে তারা বদলে ফেলে “দলের জন্য,ক্ষমতা দ্বারা,দলের সরকার” প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছে।
গত ১২বছর বা একযুগ একটানা ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই সরকারের উন্নয়নের সাফল্যের মুকুটে আনেক স্বর্ণপালক থাকলেও আবাধ ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রের পালকের অনুপস্থিতি পীড়াদায়ক।
দেশ বা রাষ্ট্রের উন্নয়ন সরকারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বর্তমান সরকার যুগব্যাপী ক্ষমতায় থেকে অনেক দর্শণীয় উন্নয়ন দেশ ও জাতিকে উপহার দিয়েছে। তাই আশা করা যায় গণমানুষের কাছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে।
এমতাবস্থায় দেশের গণমানুষের প্রত্যাশা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে যেমন স্বাধীনতা এসেছে। যেমন করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে নব উদ্যমে এগিয়ে চলেছে। তেমনি বঙ্গবন্ধু কন্যার হাত ধরে দেশ এক টেকসই গণতন্ত্রের রেল-লাইনে উঠে এগিয়ে যাবে।
গণতন্ত্রহীনতায় কোনো উন্নয়নই গণমানসে স্থায়ী রেখাপাত করে না। ইতিহাস স্বাক্ষী, চোখ ধাধা-নো উন্নয়ন উপহার দেবার পরও অনেক জনপ্রিয় সরকারও ক্ষমতা চেয়ার থেকে ছিঁটকে পড়েছে।
কারণ রাষ্ট্র জনতার। তাই জনতার চাওয়া- জনগণই নির্ধারণ করবে বা নির্বাচন করবে তার সরকারকে। তাই জনতার জন্য, জনতার দ্বারা, জনতার সরকারের কোনই বিকল্প হতে পারে না। আর এজনই চাই আবাধ,সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এই উপলব্ধি যত দ্রুত ক্ষমতাসীনদের হবে ততই দেশজাতিই শুধু নয় তাদের জন্যও মঙ্গলজনক।
 

সম্পাদকীয় এর আরো খবর