ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ এর প্রতারণা
আস্থার সংকটে দেশের অনলাইন শপিং

অনলাইন শপিং যখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ও আস্থার প্রতীক হিসেবে গ্রাহকের চাহিদা পুরণ করে চলেছে। বিশেষ করে করোনাকালে অনলাইন শপিং আরও প্রিয় ক্রয়-মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
অ্যামাজন অনলাইন শপিং ও আলীবাবা অনলাইন শপিংএর মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যখন বিশ্বজুড়ে সুনামের সাথে অনলাইন শপিং পরিচালনা করছে। তখন বাংলাদেশের অনলাইন শপিংকে জনগণের অর্থ লূটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কিছু উদ্যোক্তা নামের লুটেরা টাকা আয়ের যখন্য পথ হিসেবে  বেছে নিয়েছে।
জনপ্রিয় অ্যামাজন অনলাইন শপিংএর মালিক বিশ্বের অন্যতম ধনী ও আলীবাবা অনলাইন শপিংএর মালিকও এখন এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যাক্তি। তারা বিশ্বজুড়ে সুনামের সাথে অনলাইন শপিং পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অনলাইন শপিংএর বড় দুই প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ এর বিশাল প্রতারণার খবর এখন অনলাইন শপিংএর গ্রাহকদের আস্থার সংকট তৈরী করেছে।
ই-অরেঞ্জ সম্প্রতি খবরের শিরোনাম হয়েছে। তারা  প্রায় ২০০ কোটি টাকার অর্ডার নিয়ে উধাও বলে খবর পাওয়া গেছে।
গ্রাহকদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০০ কোটি টাকার পণ্যের অর্ডার নিয়ে ডেলিভারি দিচ্ছে না। জানা গেছে, অর্ডার নিয়ে পণ্য না দেওয়ার টালবাহানার মধ্যেই মালিকানা পরিবর্তন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন মালিকও লাপাত্তা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গুলশান কার্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্ধ কার্যালয়ের সামনে প্রায় প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছেন গ্রাহকরা।
ই-অরেঞ্জে গত ২০ মে ছয়টি মোটরবাইক অর্ডার করেছিলেন মোহাম্মদ রাব্বিল হাসান। ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তা ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও পাননি। এখন হন্যে হয়ে প্রতিষ্ঠানটির দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
সোমবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সরকারের ই-কমার্স নীতিমালা প্রকাশের আগে ই-অরেঞ্জের ডাবল টাকা ভাউচার কিনেছিলাম। কিন্তু ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষ ডেলিভারি বন্ধ রেখেছে।
গত ১৮ জুলাই ই-অরেঞ্জ একটি ডেলিভারি তারিখ প্রকাশ করে এবং পরবর্তীতে লকডাউনের দোহাই দিয়ে ডেলিভারি বন্ধ করে দেয় এবং জানায় যে লকডাউন শেষ হলে ডেলিভারি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে।
লকডাউন শেষ হওয়ার আগের দিন ১০ আগস্ট তারা আবার নতুন করে ১৬ আগস্ট ডেলিভারি লিস্ট দেবে বলে জানায়। কিন্তু পরে ই-অরেঞ্জ তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে জানায়, তাদের আগের বাইক সেলারের সঙ্গে তারা চুক্তি বাতিল করেছে।
তাই নতুন সেলার পেতে বা নিজেরা বাইক ইমপোর্ট করতে ৪৫-৬০ কর্মদিবস লাগবে। তাই যারা বাইক নিতে চায় তাদের অপেক্ষা করতে হবে, অথবা রিফান্ড রিকোয়েস্ট করতে হবে।
তিনি বলেন, বেশ কিছু গ্রাহক রিফান্ড চেয়ে ফোন করায় তারা বলে, ২১ কর্মদিবস লাগবে রিফান্ড পেতে। তখন সরকার নির্ধারিত ১০ দিনের কথা বলায় তারা কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি।
ই-অরেঞ্জের আরেক গ্রাহক হাবিবুর রহমান জানান, তিনিও সাতটি বাইক অর্ডার করেছেন। গত জুলাই মাসে অর্ডার ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা করেনি।
এখন তাদের কাছ থেকে কোনও সদুত্তর পাচ্ছেন না। তাদের কার্যক্রম দেখে বুঝতে পারছেন না কার কাছে যাবেন। জানা যায়, ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত অরেঞ্জ বাংলাদেশ লিমিটেডের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ অনলাইন শপ।
এটি ২০১৮ সাল থেকে ঢাকা শহরে অনলাইনে পণ্য দিচ্ছে। লকডাউনে তেমন কার্যক্রম না থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে একটি পোস্টের মাধ্যমে অফিস বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, গত ১১ জুলাই ই-অরেঞ্জের মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমান মালিক বিথী আক্তার। কিন্তু বর্তমান বা সাবেক মালিক সোনিয়া মেহজাবিন—কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সোমবার অফিসের হটলাইন নম্বর এবং সোনিয়া মেহজাবিনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।এদিকে, সোমবার ই-অরেঞ্জের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০ জন গ্রাহক বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
এরপর গুলশান-২ গোলচক্করে অবস্থান নেন শতাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহক। গুলশান থানার উপপরিদর্শক আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন সম্পর্কিত, এ জন্যই আমরা ক্রেতাদের ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের কাছে যাওয়ার কথা বলেছি। এর সমাধান তারাই দিতে পারবে।
ই-অরেঞ্জ গ্রাহকের টাকায় দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে বলে অভিযোগম উঠেছে। দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ নিয়ে গোয়েন্দাদের তদন্তে পাহাড়সম নজিরবিহীন সম্পদের তথ্য উঠে আসে-যা দেখে রীতিমতো বিস্মিত গোয়েন্দারা। তাদের সম্পদের পরিমাণ দেশের সীমারেখা ছাড়িয়ে গেছে ভিনদেশ পর্যন্ত। জমি, প্লট, মদের বার, রিসোর্ট, ফ্ল্যাট, ডিজে ক্লাব, ডিলারশিপ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ- কী নেই প্রতিষ্ঠানের মালিকদের। পর্তুগাল, থাইল্যান্ড, প্যারিস, ফিলিপাইন, নেপালে রয়েছে সুপারশপ, বার, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাসিনো। বিপুল পরিমাণ সম্পদের বিবরণে চোখ কপালে উঠেছে অনুসন্ধানে নামা অনেক কর্মকর্তার।
অথচ গ্রাহকদের থেকে টাকা নিয়েও পণ্য ডেলিভারি না দেওয়া ই-কমার্স প্লাটফর্ম ই-অরেঞ্জের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এখন মাত্র ৩ কোটি ১২ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৬ টাকা রয়েছে। আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছে।
এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে জানা গেছে, এ বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত ই-অরেঞ্জের অ্যাকাউন্টে ৬২০ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ৭২৯ টাকা জমা রাখা হয়। তবে, ইতোমধ্যেই আবার ৬২০ কোটি ৪৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৯২ টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমান ব্যাংক অ্যাকাউন্টটিতে মাত্র ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৭ টাকা আছে।
 
ই-অরেঞ্জের মূল পরিকল্পনাকারী ডিএমপির একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পরিদর্শক পদমর্যাদার বলে জানা গেছে। ওই কর্মকর্তার এক স্ত্রী কোরিয়ান ক্লাবের সাবেক ওয়েটার নাজনিন নাহার বীথি হলেন এই প্রতিষ্ঠানের মালিক। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হলেন তার আপন বোন সোনিয়া মেহজাবিন জুঁই এবং তার স্বামী বিকাশের ডিজিএম মাসুকুর রহমান সুমন প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা। চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে আছেন আমানউল্লাহ। যার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে আগেও মামলা হয়েছিল বেশকটি। এদের প্রত্যেকের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
 
ই-অরেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতারণা করে গ্রাহকের ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর গোয়েন্দারা তদন্ত করতে যেয়ে ভয়ংকর সব তথ্য খুঁজে পান। গোয়েন্দা সংস্থাটি এই প্রতিষ্ঠানের মালিক কর্মকর্তাদের আমলনামা তৈরি করেছে। টাকা আত্মসাতের মামলায় ইতিমধ্যে ই-অরেঞ্জের মালিকসহ তিনজন রয়েছেন কারাগারে। গতকাল সোনিয়া মেহজাবিন জুঁই ও তার স্বামী মাসুকুর রহমান এবং চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) আমানউল্লাহকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়া রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে আসামিরা পণ্য সরবরাহ না করে ১ লাখ গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য বুঝে না পাওয়ায় এর আগে ১৬ আগস্ট দিনভর ই-অরেঞ্জের গুলশান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন গ্রাহকরা।
একটা সময় ‘ই-অরেঞ্জ' শুভেচ্ছা দূত হয়েছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও জাতীয় সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা। ই-অরেঞ্জ উধাও হওয়ার ঘটনায় মাশরাফি বিন মুর্তজার মিরপুরের বাসার সামনে কিছু গ্রাহক বিক্ষোভ করেছেন।
ম্যাশের শুভেচ্ছা দূতিয়ালির মেয়াদ আরও আগেই শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তিনি প্রতারিক গ্রাহকদের মামলায় সহায়তা করেছেন।
 
ই-অরেঞ্জ এর আগে বাংলাদেশের আর এক হঠাৎ ফুলেফেঁপে ওঠা কোম্পানী “ই-ভ্যালি”র ব্যবসার ষোলআনাই ফাঁকি বলে প্রমান পাওয়া যাচ্ছে।
৫৪২ কোটি টাকা দেনার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির  মূলধন মাত্র ১ কোটি টাকা। স্থাবর সম্পদের ৩৬ গুণ বেশি দায়  এই প্রতিষ্ঠানের।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছেন, ইভ্যালি তাদের যে সম্পদ দেখিয়েছে তার প্রায় পুরোটাই অদৃশ্য বা কাল্পনিক অর্থাৎ অস্থাবর সম্পদ। কাগজে কলমে দেখালেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। যে পরিমাণ স্থাবর সম্পদ দেখানো হয়েছে তার প্রায় ৩৬ গুণ বেশি অর্থ প্রতিষ্ঠানটির দায় হিসেবে রয়েছে। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার মূলধন দিয়ে কোম্পানি তৈরি করে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করছে ইভ্যালি।
প্রতিষ্ঠানটির সর্বমোট স্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০৫ কোটি টাকার  বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সম্পদ, কারখানা এবং উপকরণের মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর কারেন্ট অ্যাসেট বা চলতি সম্পদ দেখানো হয়েছে আরও প্রায় ৯০ কোটি টাকা।
দেশে এখন এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে যারা কাগজে-কলমে সম্পদ দেখিয়ে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস থেকে নিবন্ধন নিলেও বাস্তবে এগুলোর কোনো সম্পদ নেই। এদের প্রতারণার আরেকটা বড় প্রমাণ হচ্ছে এরা গুডউইল বা ইনটেনজিবল অ্যাসেটকে বড় করে দেখায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইভ্যালি সম্পদের যে তথ্য দেখিয়েছে সেখানেও ইনটেনজিবল বা অদৃশ্য সম্পদের বড় হিসাব দেখানো হয়েছে। তাদের মোট ৪৩৮ কোটি টাকার অদৃশ্য সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ভ্যালু হিসেবে দেখানো হয়েছে ৪২২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে হঠাৎ ফুলেফেঁপে ওঠা কোম্পানী ই-অরেঞ্জ “ই-ভ্যালি”র প্রতাড়না দেশের ই-বাণিজ্যর জন্য আস্থার সংকট তৈরী করেছে। এমনটা হতে থাকলে মানুষ এই মাধ্যম থেকে মূখ ফিরিয়ে নেবে বলে বিদগ্ধজনরা মনে করেন। আমরা এই বিষয়ে সরকারের সার্বক্ষনিক মনিটরিংএর উপর গুরুত্বরোপ করছি।
 
 

সম্পাদকীয় এর আরো খবর