করোনা কালে মানুষ ও দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে আমাদের করণীয়
ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা

গতকাল ৭আগস্ট সরকার এক বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য ছিলো বহুল প্রত্যাশিত ও লাগসই সিদ্ধান্ত।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক আগামী ১১ আগস্ট থেকে ধাপে ধাপে কঠোর লক-ডাউন চলাকালের বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে। তবে সবাইকে করোনাকালীন কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে ।
 
সোমবার (৯ আগস্ট) সকালের মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সরকার এক্ষত্রে মাস্ক পরার ওপর জোর দিচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সবাইকে মাস্কও পরতে হবে, কাজও করতে হবে মাস্ক পরেই। কারণ বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, মাস্ক পরেই করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
 
গত ৫ আগষ্টে প্রবাসী বিশিষ্ট স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বিজনেস ইনসাইডারে সাক্ষাৎকারে বলেছেন এমনি কথা। তিনি বলেন, “দেশে কোভিড  সংক্রমণ আলগা হয়ে যাচ্ছে, তাই সরকারের এখন অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। তাই দেশকে ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে,অন্যথায়,অনাহারে এবং বেকারত্বের কারণে আরও মানুষ মারা যাবে।"
 
উৎপাদন ও বাণিজ্য বন্ধ থাকায় লকডাউনের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতরো আকার ধারণ করেছে। এতে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে উৎপাদন ব্যহত হয়ে। ব্যাবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ থাকায় মালিক শ্রমিক-কর্মচারী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
 
দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন সহ্য করার মতো অর্থনৈতিক অবস্থা দেশের জনগণের নেই। সম্প্রতি কঠোর লকডাউনে  দেশের সকল খাতের উৎপাদন ও বাণিজ্য বন্ধ থাকায় এই সব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রায় সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছে।
 
এছাড়া ঢাকা শহরেরই প্রায় ৭০লক্ষ ‘দিন আনে দিন খায়’ এমন কর্মজীবী মানুষ লক-ডাউনের জন্য কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে গ্রামে ফিরে গেছে। এমতাবস্তায় এইসব কর্মহীন মানুষের জন্য পরিবার প্রতি সরকারী সহায়তার ২,৫০০ টাকার নগদ সাহায্য মরুভূমিতে এক ফোঁটা পানি দেওয়ার মতো। তাই দেশের আর্থসামাজিক আবস্থার প্রেক্ষাপটে করোনার সাথে বসবাসের বিকল্প কোন পথই খোলা নেই।
তাই বাস্তবতা হচ্ছে যে আমাদের সবাইকে করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি মেনেই স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। দেশের সকল সেক্টরের সব মানুষকে তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনেই খেটে খেতে হবে। সরকার এ বিষয়টি উপলব্দি করে ধাপে ধাপে লক-ডাউনের বিধিনিষেধ শিথিল করে, কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। আমি এজন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
 
এর আগেই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড রপ্তানীমূখী শিল্প কারখানাগুলোর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকার গার্মেন্টস গুলো খুলে দিয়েছে।
জরুরী আমদানী-রপ্তানী ও প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশে গমনাগমনের  জন্য বিমানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু ছিলো । সম্প্রতি অভ্যন্তরিণ ফ্লাইটও চালু হওয়ায় জরুরী যাতায়াতের সংকটের নিরসন ঘটেছে।
 
আমরা জানি দেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত বিত্তহীন মানুষই আর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ করোনাকালের লক-ডাউনে দিশাহারা। এবং জীবনধারণের সংকটে ভুগছে। কঠোর লকডাউনে দেশের প্রায় আড়াই কোটি পরিবার এখন চরম আর্থিক সংকটে। চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছে কর্মীদের এর বড় একটা অংশ। আবার অনেকে নিয়মিত বেতন পান না, বন্ধ রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানও।
যারা দৈনিক হিসাবে কাজ করেন তাদের বেশির ভাগই এখন কর্মহীন। একই সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী মানুষ তো আরও বেশি কষ্টে আছেন।
এমতাস্থায় সরকারের লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্তে মানুষ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।
 
সরকার দেশের গণমানুষের আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপদানের জন্য ধাপে ধাপে কঠোর লক-ডাউনেরর বিধিনিষেধ শিথিল করতে চলেছে।
বেসরকারী খাতের দাবী অনুযায়ী  সরকার ইতোমধ্যে সরকারী বেসরকারী সব অফিস খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
 
সরকারের যা করণীয় তা সরকার করেছে। এখন আমাদের দেশের নাগরিকদের দায়িত্ব এই সুযোগকে কাজে লাগানো । এবং তা আবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করার মাধ্যমেই।
 
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ভূমিকা রাখে তাই এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির চাকাকে আবারও গতিশীল করবে তাতে কোনোই সন্দেহ নাই। বেসরকারী খাত আবারও চাঙ্গা হলে অনেক কর্মী তাদের কাজ ফিরে পাবে। তাদের জীবনের চাকা আবার হবে গতিশীল।
কিন্তু মালিক কর্মচারী শ্রমিক সবাই করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি যথায়থভাবে না মানলে সবকিছুই ব্যর্থতায় পর্যবশিত হবে।
 
১১ আগষ্ট থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারী বেসরকারী সব গণপরিবহন চালু হলে বেসরকারী পরিবহনের চালক-শ্রমিকরা তাদের কাজে ফিরতে পারবেন। এতে ঐসব “দিন আনে দিন খায়” পরিবহনশ্রমিকরা নতুন করে বাঁচার অবলম্বন ফিরে পারে।
কিন্তু টালক ও পরিবহনকর্মীদের এবং যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি বিশেষ করে মাস্ক পরিধানের ব্যাপরে সদা সতর্ক থাকতে হবে।
 
অতীতে দেখা গেয়ে ৫০% সিট খালি রেখে ভাড়া দেড়গুণ বাড়ালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সে বিষয়টা মাথায় রেখে এবারে সিটিং সার্ভিস সিস্টেম ফলো করা হবে। এতে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝাও  বহন করতে হবে না।
এভাবে পর্যায়ক্রমে দেশের সব সেক্টর থেকে লকডাউন শিথিল করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করার বিকল্প নেই।
 
সারাদেশ জুড়ে উপজেলা,জেলা পর্যায়ের সকল সরকারী হাসপাতাল ছাড়াও ১৯টি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালের মাধ্যমে কদের করোনরোগীদের চিকিৎসা ও দেওয়া হচ্ছে।
সরকার করোনা মহামারীকালে জনজীবন স্বাভাবিক করতে করোনার চিকিৎসা চালানোর পাশাপাশি প্রধানত দুটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
 
প্রথমটি হচ্ছে কঠোর স্বাস্থবিধি প্রতিপালন ও দ্বিতীয়টি হচ্ছে সব নাগরিককে টিকার আওয়ায় এনে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে।
সরকার দেশের টিকাদান কর্মসূচীকে দ্রততার সাথে এগিয়ে নিচ্ছে। তৃণমূলের সব মানুষ যেন টিকার আওয়ায় আসতে পারে সেজন্য গণটিকার কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছে।
 
দেশে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩ হাজার ৬২৮ জন মানুষ কোভিড-১৯ টিকার আওতায় এসেছেন। সরকার সব মানুয়ের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
 
করোনা বিরুদ্ধে সরকারের সর্বাত্মক লড়াই সত্বেও কিছু বিরোধী দল শুধুই সমালোচলার ঝাঁপি খুলে বিভিন্ন মিডিয়ায় তাদের মূখ দেখানো ছাড়া কিছুই করছেন বলে মনে হয় না।
আমি তাদের কাছে আহবান জানাই,আপনারা যদি এমন সময় ক্ষমতায় থাকতেন তবে এমন করোনা-মহামারী প্রতিরোধের জন্য কি কি করতেন। তা বলুন। সরকারকে সেব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিন। কারণ দেশ ও দেশের মানুষ এখন চরম সংকটে। এই কঠিন সময়ে কথামালার রাজনীতি না করে দেশের জনগণের জন্য  করনীয় কল্যাণকর সাজেশন সরকারকে দিন।
 
আমরা আশা করবো দেশের মানুষ কঠোভাবে করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। কিন্তু তৃণমূলেরর মানুষের মধ্যে করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবল অনিহার কারণে করোনামহামারী গ্রাম-গঞ্জে পর্যুন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশের কলকারখানা পরিবহনসহ সকল সেক্টর সচল রাখতে গিয়ে যদি কিছু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হন তবে, সরকার তাদের চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করবেন। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে করোনামাহমারী অরো ছড়িয়ে দিলে তা হবে এক হটকারী কার্মকাণ্ড। এথেকে দেশের জনগণকে সতর্ক হবার সময় এসেছে।
 
সরকার তার সর্বাত্মক সামর্থ দিয়ে করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লাড়াই করছে।
১৯৭১এর মহান মুক্তি যুদ্ধে আমরা যেমন জয়ী হয়েছি এবার এই করোনা মহামারী করোনাযুদ্ধেও আমরা বিজয়ী হবো যদি আমরা দেশের সকল মানুষ করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করি এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারটাকে সামাজিক আন্দেলনে  রূপান্তরিত করি।
 
 
 
 

সম্পাদকীয় এর আরো খবর