আরবি না জেনেও মসজিদের ইমাম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এনামুল

আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও গাজীপুরের একটি মসজিদে ৮ বছরের বেশি সময় ইমামতি করে সে। এছাড়াও, পলাতক থাকা অবস্থায় এইডস ক্যান্সারসহ নানা রোগের চিকিৎসাও করে আসছিল এ ব্যক্তি। গত ২০১০ সালে গাজিপুরে জাতীয় পরিচয়পত্র- এনাআইডি পরিবর্তন করে শেখ মো. এনামুল হক থেকে এনামুল কবীর করে সে। মূলত নিজের পরিচয় গোপন করতেই এসব কাজ করে এ ব্যক্তি।
 
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুতে রেখে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ মো. এনামুল হককে গ্রেপ্তাররের বিষয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। রবিবার (১৯ জুন) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
 
তিনি বলেন, গতকাল শনিবার রাতে র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১ এর একটি আভিযানিক দল রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ মো. এনামুল হক ওরফে শেখ মো. এনামুল করিমকে গ্রেপ্তার করে। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জনসভার অদূরে জঙ্গি শেখ মো. এনামুল করিমসহ তার অপরাপর জঙ্গি সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখার ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় হত্যাচেষ্টা, হত্যার ষড়যন্ত্র ও বিষ্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৩টি মামলা হয়। তদন্ত শেষে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালের ২৩ মার্চ গ্রেপ্তার শেখ মো. এনামুল হক ওরফে শেখ মো. এনামুল করিমসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
 
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ব্যবসায়ীক সূত্র ধরে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হুজি’র আমীর মুফতি আব্দুল হান্নানের সঙ্গে এনামুলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সে ২০০০ সালে গোপালগঞ্জ শহরে বিসিক শিল্প নগরীতে মুফতি হান্নানের ছোট ভাই আনিসের সঙ্গে যৌথভাবে প্লট বরাদ্দ নিয়ে সোনার বাংলা ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে টুথপেস্ট, টুথপাউডার, মোমবাতি ও সাবান তৈরির একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। মুফতি হান্নান ও অন্যান্য জঙ্গি নেতারা ২০০০ সালের জুলাই মাসে বেশ কয়েকবার তার ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে।
 
গ্রেপ্তার এনামুল বিভিন্ন সময়ে মুফতি হান্নানসহ অন্যান্য জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক এবং সমাবেশে অংশগ্রহণ করত। এনামুল মুফতি আব্দুল হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার জন্য পরস্পর যোগসাজশে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের হত্যার উদ্দেশ্যে কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সভাস্থলে বোমা বিস্ফোরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
 
এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে লক্ষ্যে তারা ওই কারখানায় সাবান তৈরির ক্যামিকেল সংগ্রহের আড়ালে বিভিন্ন প্রকার বিস্ফোরক দ্রব্য ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামাদি কারখানায় জমা করে লোহার ড্রামের ভিতর দুটি শক্তিশালী বোমা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জনসভার অদূরে বোমা পুঁতে রাখে।
 
এ ঘটনায় তার জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলে গ্রেপ্তার এনামুল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আত্মগোপনে চলে যায়। পরবর্তীতে সে নিজের পরিচয় গোপন করে ক্বারী না হওয়া সত্ত্বেও ক্বারী পরিচয় দিয়ে গাজীপুরের একটি মসজিদে ৮ বছরের অধিক সময় ইমামতি করে। গাজীপুরে অবস্থানকালীন সে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে। গাজীপুরে অবস্থানকালীন একটি হোমিওপ্যাথি কলেজে দুই বছর প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বলে জানা যায়। একইভাবে সে নিজেকে গাজীপুর হোমিও কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ হিসেবে দাবি করত। পরবর্তীতে ২০১০ সালে সে ঢাকার উত্তরা ও বনশ্রীতে বাসা ভাড়া করে বসবাস করতে থাকে।
 
এনামুল উত্তরায় ২০১৫ সালে ‘‘আই কে হোমিও কলেজ উত্তরা’’ নামে একটি ভুয়া হোমিও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে ‘‘আই কে হোমিও কলেজ উত্তরা’’ নামক প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে সে ক্যান্সার নিরাময় কেন্দ্র নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান খুলে ক্যান্সারের ভুয়া হারবাল চিকিৎসা প্রদান শুরু করে। তার চিকিৎসায় ক্যান্সার সম্পূর্ণরূপে ভাল হয় বলে সে দাবি করত। এছাড়া সে এইডস রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা প্রদানে সক্ষম বলে দাবি করত।
 
গ্রেফতার এনামুল সবসময় নিজস্ব গন্ডির মধ্যে চিকিৎসা প্রদান করত। এছাড়াও সে নিজেকে হেপাটাইটিস-ভাইরাস, প্যারালাইসিস, ডায়াবেটিকস, মেদ, বন্ধ্যাত্ব, টিউমার, হার্ট, কিডনী, যৌন, মানসিক রোগসহ বহুবিধ রোগের সফল চিকিৎসক হিসেবে দাবি করত।
 
ডিএমপিতে বাসা ভাড়া নিতে হলে ভাড়াটিয়াকে তার পরিচয়পত্র দিতে হয় এবং একজন ফাঁসির আসামি নতুন করে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে এভাবে ২২ বছর কীভাবে পালিয়ে ছিলেন। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে সংশ্লিস্ট কেউ জড়িত রয়েছে কি না জানতে চাইলে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০১০ সালে এনামুল ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন। এ সময় তিনি গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরে থাকার কারণে তার একটি অবস্থান তৈরি করেন। সেই হিসেবে তিনি গোপালগঞ্জের পরিবর্তে গাজীপুরের ঠিকানায় স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে এবং তার নাম এনামুল হক থেকে এনামুল করিমে পরিবর্তন করে ভুয়া এনআইডি তৈরি করেন।

সর্বশেষ সংবাদ

আইন আদালত এর আরো খবর