হুমায়ূন আহমেদের দশম মৃত্যুবার্ষিকী

বাংলা সাহিত্য জগতের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দশম মৃত্যুবার্ষিকী ১৯ জুলাই। ২০১২ সালের এই দিনেই ক্যানমারে আক্রান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বুলভিল হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি। আজ সেই বেদনাবিধুর শ্রাবণ মেঘের দিন। 
 
আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। তার অনেক গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিতও হয়েছে, যার বেশ কিছু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিরও অন্তর্ভুক্ত।
 
হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রায় প্রতিটি বই পাঠকনন্দিত। এর মধ্যে নন্দিত নরকে, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া ইত্যাদি উপন্যাস সর্বমহলেই প্রশংসা অর্জন করেছে।
 
উপন্যাসে ও নাটকে তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো বিশেষ করে ‘হিমু’, ‘মিসির আলি’, ‘শুভ্র’ তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে উঠেছে অনুকরণীয়। টেলিভিশন নাটকেও তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গস্পর্শী। হুমায়ূন আহমেদ রচিত টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’ কিংবা ‘আজ রবিবার’-এর কথা আজও দর্শক মনে রেখেছেন। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোও পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ উল্লেখযোগ্য। সংখ্যায় বেশি না হলেও হুমায়ূন আহমেদ রচিত গানগুলোও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
 
বাংলা সাহিত্যের এই জাদুকর ১৯৭২ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে সাহিত্যিক হিসেবে প্রকাশ করেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রায় প্রতিটি বইয়ের মধ্যেই পাওয়া যায় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের চিরচেনা চিত্র। নন্দিত এই সাহিত্যিক ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার শেখবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন। এরপর হুমায়ূন আহমেদসহ তিন ভাই ও দুই বোনকে বহু কষ্টে মানুষ করেছেন মা আয়েশা ফয়েজ। যার ফলও পেয়েছেন রত্নগর্ভা এই জননী। বড় সন্তান হুমায়ূন হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের জাদুকর। তার আরেক ছেলে কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল দেশবিখ্যাত শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক। সবার ছোট আহসান হাবীবও নামকরা কার্টুনিস্ট এবং রম্যলেখক।
 
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯৪ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩ ও ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেছেন।
 
হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে কোনো আয়োজন নেই। তবে লেখকের নির্মিত নন্দনপুরী গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে থাকছে আয়োজন। সকালে কোরআন খতমের আয়োজন করা হয়েছে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের সমাধিতে ফুল দেওয়া হবে। দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল প্রচার করবে হুমায়ূন আহমেদের লেখা নাটক ও চলচ্চিত্রগুলো। 
 
লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, “১০ বছর হয়ে গেল হুমায়ূন আহমেদ না ফেরার দেশে আছেন। ১৯ জুলাই ২০১২-এর পর এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন আমি তাকে স্মরণ করিনি।”
 
তিনি বলেন, “গত দুই বছর মহামারী করোনার প্রকোপ আমাদের জীবন প্রায় স্থবির করে দিয়েছিল। আমরা হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে একত্র হতে পারিনি। তবে তার স্মরণে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বেশকিছু পরিবারের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় আমরা করোনা মহামারী অনেকটা সামলে উঠেছি। আবারও আমরা নুহাশপল্লীতে প্রিয় হুমায়ূনের স্মরণে কোরআনখানি এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছি। আমাদের সঙ্গে থাকছে গাজীপুর এলাকার কয়েকটি এতিমখানার শিশুরা। বাদ জোহর দোয়া মাহফিলের পর আমরা হুমায়ূনকে স্মরণ এবং শিশুদের নিয়ে তার প্রিয় খাবার উপভোগ করব।”

সর্বশেষ সংবাদ

শিল্প ও সাহিত্য এর আরো খবর