সর্বশেষবিশেষ

আইসিইউতে থাকা তাহরিন জানে না মা–বাবা আর বেঁচে নেই

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের

মা ও বাবার সাথে বেড়াতে যাওয়ার সময় ছয় বছরের তাহারিন জাহান তার দাদার মেলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দাদা আলাউদ্দিন তার নাতনিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সে ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরলে তাহরিনকে মেলায় নিয়ে যাবে। কিন্তু তাহরীন আর বাড়িতে ফিরে আসেনি।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ছোট্ট শিশুটি। বাবা-মায়ের মৃত্যুর খবর সে এখনও জানে না।প্রাইভেটকারের ধাক্কায় ট্রাক চালক দম্পতি প্রাণ হারিয়েছেন

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন-রিংসি সড়কের গঙ্গানগর এলাকায় দুর্ঘটনায় মারা যান তাহরিনের বাবা ঠিকাদার নাজমুল হোসেন ও মা স্কুল শিক্ষিকা তাহমিনা আক্তার। নাজমুল নয়াকালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী গ্রামের বাসিন্দা। তাহমিনা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার নয়ামতি এলাকার আলাউদ্দিনের মেয়ে। সোনারগাঁয়ে বাবার বাড়িতে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন।

তাহরিন
আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছয় বছরের শিশু তাহরিন

আজ শনিবার সকালে বৃদ্ধ আলাউদ্দিনকে তার বাড়িতে যেতে দেখা যায়, ঘরের কাজ করতে। ছাত্ররা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বৃদ্ধ আলাউদ্দিন বাড়ি যেতে এগিয়ে এলেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা বিচার চাই না। কার কাছে আমার বিচার আছে?’ তিনি বলেন, নিজের হাতে তাঁর একমাত্র কন্যা ও নিঃসন্তান স্ত্রীকে কবর দিয়েছেন। এখন তার মৃত্যুতে শোক করার বা বিচার চাওয়ার সময় নয়। যে কোনো মূল্যে তিনি তার আদরের নাতনি তাহরিন কে সুস্থ করতে চান।

বৃদ্ধ আলাউদ্দিন তার নাতনিকে মেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য টাকা আলাদা করে রেখেছিলেন। সেই টাকা হাতে ধরে বারবার অভিযোগ করে বলছেন, ‘কেন এমন হলো?’ এখন আমার নাতনি, মা বলবে কে, বাবা বলবে কে।’ বাড়িতে এসে প্রতিবেশীদের কাছে দোয়া চেয়েছেন তাহরিন, ‘আপনারা সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, আমার নাতনি তাহরিন সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক।’

আলাউদ্দিনের কাছে এগিয়ে আসেন নিহত নাজমুলের বাবা নাজিম উদ্দিন। আপনার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিন। তিনি জানান, সকালে ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে পরিবারের সঙ্গে নয়াখালী থেকে আসেন। ছেলে ও তার স্ত্রীকে একসঙ্গে কবর দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে সে লাফিয়ে উঠে।

নাজিম উদ্দিন জানান, গতকাল বিকেলে নাজিমুল তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে রূপগঞ্জের পূর্ব দিকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। পিকনিক সেরে সন্ধ্যায় ফিরলাম। রূপগঞ্জের কাঞ্চন-রিংসী সড়কের গঙ্গানগর এলাকায় পেছন থেকে একটি মাইক্রোবাস মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়।

এ সময় নাজমুল ও তাহমিনহা একটি ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই মারা যান। ট্রাক চালক প্রথমে তার কোলে থাকা মেয়ে তাহরীনকে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। মাথায় ও বুকে আঘাত পেলেও বেঁচে যান তাহরীন। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে পাঠায়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শেষ বিকেল। এসময় এক তরুণী ছুটে আসে বৃদ্ধ আলাউদ্দিনের কাছে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘চাচা ভাই, আপনি চলে গেছেন’। মেয়েটির হাত থেকে ফোন নিয়ে বাড়ির পাশের কালো রাস্তায় চলে যায় আলাউদ্দিন। সৌদি আরব থেকে ফোন করেন তার একমাত্র ছেলে ইব্রাহিম। বোন ও স্ত্রীর মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে আলাউদ্দিন তাদের মৃত্যু দেন। ইব্রাহিম গণমাধ্যমের মাধ্যমে খবর পান। টেলিফোনে তার বোনের মৃত্যুর খবর বাবাকে জানিয়ে এড়াতে চেয়েছিলেন।

ছেলেটির প্রশ্নে বৃদ্ধ লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন। সে বলল, বাবা আমি তো পাগল হয়ে গেছি, কি করে বলি তোমার বুকে থাকা সম্পদের কথা আমি পড়িনি বা বলিনি। আমার নাতনির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন। মাকে হারানোর বেদনা ভুলে হৃদয়ে ধারণ করি।’

ফোনে শোনা গেল বাবা-ছেলের অভিমান আর অসম্মানের কথা। তাদের কথোপকথন শুনে আমার চোখে পানি চলে আসলো। ছোট্ট তাহরীন এখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সে এখনও জানে না তার বাবা-মা আর বেঁচে নেই।

আরো পড়ুন

গৃহবধূ খুন বোন আটক ফতুল্লায়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button